ঘুরে আসুন নিঝুম দ্বীপ
আব্দুর রাজ্জাক: আমাদের ভ্রমণটা ছিল ১৬-১৭ নভেম্বর। রামগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খোন্দকার মোহাম্মদ রেজাউল করীম স্যার এর তত্বাবধানে। রামগঞ্জ উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তাবৃন্দসহ আমাদের এই নিঝুমদ্বীপ ভ্রমণ।একজন নির্বাহী কর্মকর্তা যে এতটা আন্তরিক এবং উধার মনের ও অতিথি পরায়ন হয় তা আগে কখনো দেখিনি বা জানাও ছিল না। হয়তো তিনি না হলে এমন আনন্দের ভ্রমণ করা আমাদের পক্ষে সম্ভব হত না।
এখন আসি বিস্তারিত আলোচনায়… খরভব রং ইবধঁঃরভঁষ. ইধহমষধফবংয রং ঝঁঢ়বৎ ইবধঁঃরভঁষ. -শুরুটা এভাবেই করলাম। পরের কথাটা বই-পুস্তুকের কিতাবি ভাষার মত শোনাবে, তবুও বলি- সত্যিই আমাদের দেশটা অনেক সুন্দর। এমন সব অসাধারণ প্রাকৃতিক অপার সৌন্দর্যের জায়গা আমাদের দেশে আছে যে, সে সৌন্দর্যের তুলনা হয় না। শুধু খুঁজে নিয়ে কাছে গিয়ে মন থেকে একবার দেখে নিয়েন সত্য কিনা। অনেকদিন যাবৎ হ্যাংআউটে বের হওয়া হচ্ছিল না, একটা রিফ্রেশমেন্টের খুব প্রয়োজন ছিল। হঠাৎ করেই রামগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তার নেতৃত্বে বনভোজনে যাবার সিদ্ধান্ত হয়। উপজেলার সকল কর্মকর্তাদের সাথে নিয়েই এই বনভোজনের আয়োজন করা। আরেকটা কথা জেনে রাখা ভাল। নেয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন বর্তমান ল²ীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজাউল করিম স্যার, তিনি আমাদের আনন্দ ভ্রমণের উদ্দ্যোক্তা এবং পরিচালক।
নিঝুম দ্বীপ সম্পর্কে একটু প্রাথমিক ধারণা দিয়ে রাখি—নিঝুম দ্বীপ বাংলাদেশের দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরের মাঝে নোয়াখালি জেলার অন্তর্গত উপজেলা হাতিয়া দ্বীপের পাশে (হাতিয়া থেকে ৬০ কি.মি. দক্ষিণে) অবস্থিত মাত্র ৬৩ বর্গমাইল আয়তনের একটি ছোট দ্বীপ। এখানে সরকারি হিসেবে ৬ হাজার ভোটার আছে, আর জনসংখ্যা প্রায় ৬০ হাজার। এটা বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ যেখানে আপনি একইসাথে কক্সবাজার এবং সুন্দরবনের স্বাদ নিতে পারবেন। অর্থাৎ এ দ্বীপের দক্ষিণে আছে ১২ কি.মি. জুড়ে বিশাল সমুদ্র সৈকত, আবার আরেক পাশে আছে ম্যানগ্রোভ বন, যেই বনে আছে ৩৫ প্রজাতির পাখি আর প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার হরিণ। আছে বনের পাশে সাগরের দিকে বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, নিউজিল্যান্ডের মত সে মাঠে শত শত গরু-মহিষ চড়ে বেড়াচ্ছে। বাংলাদেশ সরকার নিঝুম দ্বীপকে জাতীয় অভয়ারন্য হিসেবেও ঘোষণা করেছে।
আমাদের যাত্রা : শুক্রবার সকাল ৭.৩০ সবার একত্রিত হবার কথা ছিল। কিন্তু একটু ব্যক্তিগত সমস্যার কারণে ৯ টায় আমাদের রওয়ানা দিতে হল। আরো একটু যুক্ত করতে চাই সেটা হল। গত কয়েকদিন ধরেই আমার সহধর্মিনী আমাকে অতিষ্ঠ করে ফেলেছিলেন যে আমি যাচ্ছি কিনা উনাদের সাথে। আমিও একটু রাগাবার জন্য মাঝে বলতাম যে না আমি যাচ্ছি না তুমি যাও ঘুরে আস। যেদিন আমরা রওয়ানা হব সেদিন তো সকালেই এক প্রকার হামকি দামকি খেতে হয়েছে ম্যডামের… থাক বাকিটা ইতিহাসের পাতায়।
সকালে সবাই এসে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছেন আমরা আসতে একটু দেরি হয়েছিল যদিও প্রথমে সবার আগে আমরা রেডি হয়েছি। সকালের নাস্তাটা আমাদের গাড়ীতেই করতে হয়েছে। দুপুর ২টার দিকে আমরা পৌছলাম আমাদের গন্তব্যে-চেয়ারম্যান ঘাটে। ঘাটে আমাদের জন্য আগে থেকেই অপেক্ষা করছিল ৩টি স্প্রীড বোড। যা নির্বাহী কর্মকর্তা মহেদয়ের আদেশেই তারা অপেক্ষা করছিল।নিঝুম দ্বীপ যেতে হলে চেয়ারম্যান ঘাট প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে যেতে হয়। স্প্রীড বোডে করে যেতে আমাদের সময় লেগেছে প্রায় দেড় ঘন্টা।
আমরা নিঝুম দ্বীপ নেমেই আনন্দে আত্মহারা হয়ে পড়লাম। আমাদের আনন্দ দেখে সবাই একটু চমকে গেল। আরেকটা কথা আমাদের গাইড করেছেন আমাদের শ্রদ্ধেয় রেজাউল করিম স্যার। কাজেই আমাদের কোন সমস্যাই হয় নাই। আমরা সবাই বিকাল সাড়ে তিনটায় গিয়ে পৌছালাম সেখানেও আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলনে সেখানকার সার্কেল অসিসহ আরো অনেকেই। আমাদের খাবার দাবার সব আগে থেকেই তৈরি ছিল। তাই আর কষ্ট হয় নাই। একটু ফ্রেস হয়ে সবাই খাবার দাবারের কাজ টা সেরে ফেললাম।
তারপর ১০ মিনিট বিশ্রাম নিয়ে সবাই চলে গেলাম বীচে সেখানে গেলেই মনে হবে আপনি সেন্টমার্টিনের বীচে আছেন। বিসাল প্রান্তর আমাদের সাথে ছিল ফুটবল, ক্রিকেট ব্যাট-বল। আরম্ব করলাম ফুটবল খেলা যে খেলাতে ছিল না কোন রেফারি ছিলনা কোন পাশ্য রেখা শুরু হল খেলা কিছু সময় খেলাধুলা করলাম কিন্তু যতই সময় যেতে লাগলো ততই খেলোয়ারের সংখ্যাও কমতে শুরু করলো হা হা হা….। অবশেষে সবাই সন্ধা হতেই ফিরে এলাম রিসোটে। একটু ফ্রেস হয়ে সবাই রেস্ট হাউজের সামনে জড়ো হলাম ডাব ব্রেকে যদিও সেখানে রাতে কেউ ডাব গাছে উঠে না। স্থানীয় এক মেম্বারের সহযোগীতায় (ইউএনও) স্যার ব্যবস্থা করলেন।

সবাই ডাব ব্রেক শেষ করলাম। তারপর সাংস্কৃতি পর্ব শুরু হল। বালিশ খেলা, চোখ বাধা, ভাগ্য নির্ধারণ খেলা। সর্বশেষ পর্ব ছিল গান। তারপর সবাই রাতের খাবারের জন্য তৈরি হলাম। কিন্তু এত তাড়াতারি তো আর রাতের খাবার খাওয়া যায় না সময় তখন ৯টা আমরা সবাই চলে গেলাম সমুদ্র পাড়ে তখন জোয়ার ছিল তাই একদম কাছে ছিল পানির ঢেউ আর চাদের আলো ভালই কেটেছে সেই মুহুর্ত। তার সবাই রাতের খাবার খেতে আসলাম। আমাদের রাতের খাবারের মেনুতে ছিল রুটি-পরটা সাথে হাঁসের গোসত ও কাঁকড়া ভুনা। অন্যরকম এক আয়োজন যা সারা জীবন মনে থাকবে। ধন্যবাদ স্যার আপনাকে।
আরেকটু বলে রাখি.. নিঝুম দ্বীপে লোকজনের কাছে শুনেছি- ২/৩ বছর আগেও সন্ত্রাসী, ডাকাতরা এখানে আসত। কিন্তু এখন সম্প্রতি যৌথ অভিযানে সবাইকে মেরে ফেলা হয়েছে। এখন আর কোন সমস্যা নেই। গ্রামের মানুষজন সম্পর্কে বলি- ঠিক এপাড়ের হাতিয়ার মানুষ থেকে নদীর ওপাড়ের নিঝুম দ্বীপের মানুষ সম্পূর্ণই ভিন্ন। নিঝুম দ্বীপের সাধারণ মানুষ একদমই সাদামাটা ও সরল। খুবই সাধারণ তাদের জীবন।
তারপর সবাই কিছুক্ষণ গল্প করে যার যার রুমে চলে গেলেন। আমরা তখনো রিসোর্টের সামনে বসে গল্প করছিলাম। রাত তখন ১২টা তখন স্যার বললেন চল একটু বনের দিকে হেটে আসি। আমরাও চললাম একটু হাটতেই দেখি অন্ধকারে ২টা লাইট মানে হরিণের চোখ আরকি সবাই তো খুশিতে আত্মহারা এক কাছ থেকে বনের হরিণ দেখার সুযোগটা হয়তো আর কখনো হবেনা। তাই সবাই মিলে একটু হরিণের সাথে গোল্লাচুট খেলার মত পরিবেশ তৈরি করলাম।

পরের দিন সকালে সবাই আবার ঘুম থেকে উঠে ফ্রেস হয়ে ডাব খাওয়ার পাট শেষ করলাম। এখন আমাদের গন্তব্য নিঝুম দ্বীপের অপর প্রান্তের মেম্বারবাড়ী। এই যাত্রাটা আমাদের জন্য অন্যরকম ছিল। সকাল ১০টার মধ্যে আমাদের নিঝুমদ্বীপ ছাড়ার কথা তাই সবাই একটু তাড়িঘড়ি করে বের হলাম। আমাদের জন্য নির্বাহী কর্মকর্তা স্যার খবর দিলেন কয়েকটি মোটরসাইকেল ওয়ালাকে। সেখানে বিকল্প তেমন একটা যানবাহন নেই। তাই সবাই যে জার মত করেই উঠে পড়লেন মোটরসাইকেলে। আমি আর স্যার তো একটু বিপদে ছিলাম কারন আমাদের তো যাত্রীরা ছিলেন আর দশ জনের চাইতে আলাদা তাই আর কি করা। চললাম সবার শেষে আমি আর স্যার। মাঝ পথে আবার আমাদের পেচেঞ্জার বদলের পালাও সেরে ফেললাম।

অনেক মজার ছিল সেই সময়টুকু বিশাল মাঠ চারপাশে মাঝে মাঝে দুএকটা বাড়ি আর তারপর বিশাল বন মনে হচ্ছে যেন সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে আমাদের গন্তব্য। তবে সবার চোখ ফাঁকি দিয়ে আমাদের সেলফি তোলাটা মিস করলাম না। গন্তব্যের মাঝে মাঝে একটু বিরতিও ছিল। তার পর সবাই ঘোরাফেরা শেষ করে নাস্তার টেবিলে বসলাম নাস্তা শেষ করেই বাড়ির পথে রওয়ানা হবার জন্য সবাই তৈরি হতে লাগলাম। তখন খুব খারাপ লাগছিল। মনে হচ্ছিল যে আরো একটু থাকি আরো একটু উপভোগ করি।

সবশেষ রওনা হলাম নিজের বাড়ির উদ্দেশ্যে। ভাল মত ব্যাগ গুছিয়ে নিলাম, বার বার চেক করে নিলাম সবকিছু ঠিকঠাক মতন নিয়েছি কিনা। কিন্তু তারপরেও নিঝুম দ্বীপ ছেড়ে চলে আসার সময় থেকে এখন পর্যন্ত মনে হচ্ছে- কি যেন নিয়ে আসিনি, কি যেন ফেলে এসেছি, কি যেন রেখে এসেছি! :আমি হয়তো খুব ভাল করে লিখতে পারিনি আমাদের সেই যাত্রা নিয়ে। তবে সবাই অনেক অনেক ভাল সবাইকে অনেক মিস করবো। বিশেষ করে রেজাউল করিম স্যারকে। আর যারা আমাদের সাথে যান নাই তাদেরকে বলবো যে আপনার মিস করলেন অনেক কিছু!!!




