সময়ের কাছে হেরে যাওয়া একজন মায়ের গল্প
সালটা ছিল ২০০৬। ক্লাস থ্রিতে পড়ি। স্কুল ছুটিতে সেবার ঢাকা গিয়েছিলাম ঘুরতে। কাক্কুর সাথে বের হয়ে শিশু পার্কে গেলাম। কাক্কু বললো তার বন্ধু আসবে। আমি বলেছিলাম কেমন দেখতে তোমার বন্ধু?। বলেছিলো বেটে, নখ অনেক বড়,চুল বড়, সিগারেট খায় সে। চেহেরা ভালো না। হঠাৎ দেখি এক সুন্দরী নারী আমাকে ডাকছে, “স্মৃতি মা কেমন আছো? `কাক্কু’কে শুধু বলেছিলাম এত সুন্দর মেয়ে বন্ধু তোমার? সেদিন সে ছিলো আমার স্বর্ণালী ফুপি। আজ সে হয়ে গিয়েছে আমার স্বর্ণালী মা।
বন্ধু-বান্ধব অনেকের কাছেই শুনতাম, মামী চাচীরা রবী ঠাকুরের গল্পের ফটিকের মামির মতোই হয়। অনেকের এই ধারনা ভেঙ্গে গেছে আমার স্বর্ণালী মাকে দেখে। একজন চাচীও যে মায়ের মতোন আপন হয়ে উঠতে পারে তার উদাহরণ হলো স্বর্ণালী মা! আসলে চাচী হলেও সম্পর্ক ছিলো মা-মেয়ের বন্ধুত্বের মতন। একদম আলাদা। ভরসার, বিশ্বাসের। যাকে চোখ বন্ধ করে সব বলা যেত।
যখন নতুন বউ হয়ে আসে আমাদের বাড়িতে আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম কি বলে ডাকবো তোমাকে? মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিল, যা ইচ্ছা হয় ডেকো। না হলে আমার নাম স্বর্ণালী সেটাও ডাকতে পারো। আমি বলেছিলাম, আচ্ছা ভাবতে হবে আমার। স্বর্ণালী চাচী কখন থেকে যে স্বর্ণালী মা হয়ে গেলো সেটা এখন আর মনে নেই।এইচএসসি’র পর ঢাকাতে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষার কোচিং করতে আসি প্রথমে উঠি তার বাসায়। কোচিং থেকে ওর বাসা দূরে হওয়াতে কোচিং এর পাশে এক হোস্টেলে উঠি। এক রাতও থাকতে পারি নাই অভ্যাস ছিল না বলে। পরের দিন সকালে এসে মা নিয়ে গেল তার বাসায়। আর বললো, এইখান থেকে যেতে কষ্ট হবে একটু; তবে বাকিটা আমি দেখবো।
অফিস থেকে কল দিয়ে বলতো , তৈরি হয়ে নে । ঘুরতে যাবো । অথবা বলতো শপিংয়ে চল আজ। সারাদিনের জমানো কথাগুলো স্বর্ণালী মা বাড়ি ফেরা মাত্র শেষ করতাম। মা ছিলো খুব শপিং পাগল। আমরা বেশির ভাগ সময়ই এক রকম জামা কাপড় পড়ে বের হতাম। মানুষরা ভাবতো, ও আমার বন্ধু কিংবা বোন। কাক্কুর চেয়েও আমার স্বর্ণালী মা’র সাথে এতো ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল যে মনে হত যেন তার মাধ্যমেই কাক্কুর সাথে পরিচয়।সারাদিন অফিস করেও সে রাতে আমার জন্য রান্না করতো। আমি যা যা খেতে ভালোবাসি সেই সব খাবার রাঁধতো। সত্যি বলতে আম্মুর পরেই স্বর্ণালী মা ছিলো ভরসার জায়গা।
এ বছর সেপ্টেম্বরে হঠাৎ তার ক্যান্সার ধরা পড়ে। স্টোমাক ক্যান্সার। লাস্ট স্টেজ। অনেক কিছুই বাকি ছিলো। মাকে চেন্নাই নেয়া হয়।চিকিৎসার জন্য। সেখানকার ডাক্তাররা বলে দেয় কিছু করার নেই । দেশে নিয়ে যান। সেখানকার ডাক্তাররা যা বলে তাই করেন। সেই সাথে ডাক্তাররা তাকে বলে দেয় তার রোগের কথা। মা খুব শক্ত মনোবলের মানুষ। এসব শোনার পর শুধু বলেছিলো সময় কত দিন আছে?
মা সব সময় আমাকে বলতো চিতুন (আদর করে আমাকে এই নামে ডাকে) তোর বিয়েতে আমাকে মা বলে ডাকবি না। বলবি বন্ধু । আমি বর পক্ষের লোক দের সাথে যেন ফ্লাটিং করতে পারি। আমি হাসতাম শুধু। মা বলতো তোর জামাই যদি আমাকে লেহেংগা না দেয় আর পার্লারে গিয়ে না সাজানোর ব্যাবস্থা করে তাহলে আমি কিন্তু ঐ জামাই এর সাথে তোর বিয়ে দিব না। আজ মা চলে যাচ্ছে কিছুই পারলাম না তার জন্য করতে।চেন্নাই যাওয়ার আগে তার একটা সার্জারি করা হয়। খাদ্যনালী লাগিয়ে দেয়া হয় বাইপাস সার্জারি করে। ও আসলে কিচ্ছু খেতে পারতো না। যা খেত সব বমি হয়ে যেত। সার্জারির পর মা বলতো, এখন সুস্থ হয়ে যাবো। এত টেনশন নিও না। ও আসলে জানতো না ওর যে সব কিছু গ্রাস করে নিয়ে যাচ্ছে মরণব্যাধি ক্যান্সার।
স্বর্ণালী মা শক্ত কিছু খেতে পারতো না। সব লিকুয়িড খাবার খেত। আর খাবার খাওয়ার সাথে সাথেই তা বমি করে দিত। ওর লাস্ট সময়গুলো বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল। সেখানে নাকে নল দিয়ে দেয়া খাবার গ্রহণের পরই অপর দিকে লাগানো নল দিয়ে সব বের হয়ে যেত। ওর শরীরের কন্ডিশন এত খারাপ ছিলো যে শেষের দিকে কোনও ক্যামু দেয়া যায়নি। তাকে প্যালিয়েটিভ কেয়ারে রাখা হয়। যেখানে শুধু ব্যথা কমানোর ব্যাবস্থা নেয়া হয়। রোগী যতদিন বেঁচে থাকবে শুধু সে কয়েকদিন যেন একটু ভালো থাকে।
লাস্ট সময়গুলো ও আর সহ্য করতে পারতো না। লোয়ার বডিতে পানি এসে গিয়েছিলো। নড়াচড়া করতে পারতো না। সারাদিনে দুইটি স্যালাইন চলতো। ঘুমের ওষুধ মাইলাম আর ব্যথার জন্য মরফিন এলজিন এগুলো দিয়ে রাখা হত। খুব কষ্ট হচ্ছিলো ওর।আমার সাথে শেষ কথা বলে ও এই মাসের ১৭ তারিখ। বলেছিলো চিতুন থাকলে ঘুম ভালো হয়। ভরসা পায় সে। এরপর আর কথা বলতে পারে নি। সারা শরীরে অসংখ্য টিউমার ছডিয়ে গিয়েছিলো। সেটা গলা অবধি চলে যাওয়ায় কথা বলতে পারতো না। ডাক্তাররা বলেছিলো মাথাতেও ছড়িয়ে যাবে। তখন চোখে আর দেখতে পারবে না।
ওর ৩ বছরের বাচ্চা ছেলেটা আসে। মা মা করে ডাকে। কিন্তু ও কোনও রেসপন্স করে না। পিচ্চিটা বিরক্ত হয়ে চলে যায়। আসলে ও কিছু বুঝতেছে না ও কি হারাতে যাচ্ছে!আমি সব সময় মার মতো হতে চাইতাম। তার মত ধৈর্যশীল হতে চাইতাম। একটা মানুষ কিভাবে এত ভালো হতে পারে, সব দিকে কিভাবে ব্যালেন্স করে চলতে পারে এসব আমাকে সব সময় মুগ্ধ করতো। সে একজন সফল নারী আমার মতে। সফল স্ত্রী,বাড়ির বউ,মা এবং চাকুরীজীবি নারী। আজ শুধু সে সময়ের কাছে হেরে গেল।




