পরকীয়ার অজুহাত দেখিয়ে গাছে বেঁধে গৃহবধূকে নির্যাতন
কুমিল্লায় পরকীয়ার অজুহাত দেখিয়ে এক গৃহবধূকে নির্মম নির্যাতন করা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার ওই গৃহবধূর নাম আসমা আক্তার। সালিশ বৈঠকে বিচারের নামে প্রকাশ্যে গাছে বেঁধে নির্যাতনসহ জনসম্মুখে পায়ের তালুসহ সারাদেহে পিটিয়ে তাকে গুরুতর জখম করা হয়েছে। এ সময় পিটিয়ে আহত করা হয়েছে নুরে আলম নামে একই গ্রামের এক যুবককেও।
গত ১ আগস্ট জেলার দাউদকান্দি উপজেলার বারপাড়া ইউনিয়নের বেকি সাতপাড়া গ্রামে এ অমানবিক ঘটনা ঘটে। এদিকে ঘটনার পর পাষণ্ডদের হুমকির কারণে নির্যাতীতরা মুখ না খুললেও তাদের প্রকাশ্যে নির্যাতনের সময় ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ভাইরাল হয়ে গেছে। এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন নির্যাতিতা আসমার পরিবার ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যানসহ এলাকার লোকজন। শনিবার পর্যন্ত এ ঘটনায় পুলিশ এ ঘটনায় ২ জনকে গ্রেফতার করেছে। তবে অপর ৩জন পলাতক রয়েছে।
আসমার স্বজনরা জানায়, জমি সংক্রান্ত ভাগ-বাটোয়ারাকে কেন্দ্র করে আসমাকে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে বাড়ি থেকে বের করতে নুরে আলম নামে এক যুবককে আটকে পরকীয়ার মিথ্যা নাটক সাজিয়েছে এবং নির্যাতন করে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। এ ঘটনায় গত ৩ আগস্ট নির্যাতিতা আসমার বোন নার্গিস আক্তার বাদী হয়ে ৫জনকে আসামি করে দাউদকান্দি মডেল থানায় মামলা দায়ের করেন।
মামলার আসামি পক্ষের লোকজন বলছেন, আসমার স্বামী দেশের বাইরে থাকে। এ সুযোগে দীর্ঘদিন ধরে একই এলাকার নুরে আলম নামে এক যুবকের সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক গড়ে ওঠে। ওইদিন রাতে আমরা উভয়কে হাতেনাতে আটক করি।
এদিকে স্বামী বিদেশে থাকায় পরকীয়ার অজুহাতে নির্যাতনের শিকার আসমা আক্তার এখন পৈত্রিক বাড়িতে দিন কাটাচ্ছেন। আঘাতের যন্ত্রণায় পায়ে ভর করে হাঁটতে পারছে না এবং ভাগ্যের এ পরিণতির কথা ভেবে কেঁদে কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন। রাতভর গাছে বেঁধে নির্যাতন এবং সকালে এলাকার লোকজনের সামনে পিটিয়ে জখম করা তা যেন কোনভাবেই মেনে নিতে পারছেন না আসমা ও তার পরিবার। তারা ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
নির্যাতনের শিকার আসমা আক্তার জানান, ‘এলাকার হাজার মানুষের সামনে আমাকে এভাবে নির্যাতন করেছে। ভাসুর ও দেবররা সংঘবদ্ধ হয়ে আমার হাত-পায়ে পিটিয়ে চাপ দিয়ে ধরে এলাকার লোকজনের সম্মুখে নির্যাতন করেছে। আমার এক পায়ে পা দিয়ে চেপে ধরে অপর পা উপরে তুলে পায়ের তলায় পিটিয়েছে। আমি মাগো মাগো করে চিৎকার করলেও কেউ আমাকে উদ্ধারে এগিয়ে আসেনি।’
এ বিষয়ে বারপাড়া ইউপি চেয়ারম্যান মনির হোসেন তালুকদার জানান, ‘ওই গৃহবধূর উপর পরকীয়ার অভিযোগে আটকে রেখে প্রকাশ্যে নির্যাতনের খবরে আমি সেখানে ছুটে গিয়ে তাকে উদ্ধার করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করি এবং থানায় মামলা দায়েরের পরামর্শ দেই। ওইদিন আমি সেখানে না গেলে তাকে হয়তো মেরেই ফেলা হতো। যারা এ জঘন্য কাজটি করেছে আমি তাদের বিচার চাই।’
মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে দাউদকান্দি থানার ওসি মো. আলমগীর হোসেন জানান, ‘এ মামলায় অভিযুক্ত সাইফুল ইসলাম ও বাবুল নামে দুইজনকে গ্রেফতার করে জেলহাজতে প্রেরণ করেছি এবং অপর আসামিদের গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে।’
জানা গেছে, প্রায় ১৮ বছর আগে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার বেকি সাতপাড়া গ্রামের সামছুল হক বেপারীর ছেলে কবির হোসেনের সঙ্গে পার্শ্ববর্তী বড় গোয়ালিয়া গ্রামের মৃত সামছু মিয়া তালুকদারের মেয়ে আসমা আক্তারের বিয়ে হয়। স্বামী কবির হোসেন মালয়েশিয়া প্রবাসী। দাম্পত্য জীবনে মেহেদী হাসান, হোসাইন, সামির ও জুনায়েদ নামে তাদের ৪ সন্তান রয়েছে।
বিয়ের পর থেকেই শ্বাশুড়ি ধনি বেগম ও ভাসুর সাইফুল ইসলাম স্বপনদের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আসমার মনোমালিন্য চলে আসছিল। গত ২৭ জুলাই তুচ্ছ ঘটনায় ফের শ্বাশুড়ির সঙ্গে তার ঝগড়া হয়। এরপর গত ৩১ জুলাই রাতে নুরে আলম মিন্টু নামে এক যুবককে ঘরে আটকে রেখে পরকীয়ার অপবাদ দিয়ে উভয়কে গাছের সঙ্গে বেঁধে নির্মমভাবে নির্যাতন করে বলে স্থানীয় লোকজন জানান।




