216767

আর সরকারি চাকরি পাওয়া হল না রাজীবের









নিউজ ডেস্ক।। অবশেষে জীবন সংগ্রামে হেরেই গেলেন দুই বাসের রেষারেষিতে ডান হাত হারানো রাজীব হোসেন। সোমবার রাতে সাড়ে ১২টার দিকে ঢাকা মে‌ডি‌কেল ক‌লেজ হাসপাতা‌লে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সরকারি তিতুমীর কলেজের স্নাতকের (বাণিজ্য) দ্বিতীয় বর্ষের এই ছাত্র।

গত ৩ এপ্রিল বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের পেছনের গেটে দাঁড়িয়ে গন্তব্যে যাচ্ছিলেন রাজীব। তার হাতটি বেরিয়ে ছিল সামান্য বাইরে। হঠাৎই পেছন থেকে একটি বাস বিআরটিসির বাসটিকে পেরিয়ে যাওয়ার বা ওভারটেক করার জন্য বাঁ দিকে গা ঘেঁষে পড়ে। দুই বাসের প্রচণ্ড চাপে রাজীবের হাত শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। দু-তিনজন পথচারী দ্রুত তাকে পান্থপথের শমরিতা হাসপাতালে নিয়ে যান। পরে রাজীব‌কে ঢাকা মে‌ডি‌কেল ক‌লে‌জে স্থানান্তর করা হয়। এর দুদিন পরই ঢামেকে রাজীবকে দেখতে গিয়ে সুস্থ হলে তাকে সরকারি চাকরি দেয়া হবে বলে আশ্বাস দেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম।

কিন্তু রাজীবের ভাগ্যটা আসলেই খারাপ, সরকারি চাকরিটা আর পাওয়া হল না তার। চিকিৎসকেরা হাজার চেষ্টা করেও তাকে আর বাঁচিয়ে রাখতে পারলেন না। গত সোমবার থে‌কে তার মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ শুরু হয়। রাজী‌বের মস্তিষ্ক অসাড় হ‌য়ে যায়। এরপর আর জ্ঞান ফেরে‌নি তার।

বেঁচে থাকলে হয়ত তার একটা সুন্দর ভবিষ্যত হতো, একটা সরকারি চাকরিও পেতেন যা এখনকার যুবকদের কাছে সোনার হরিণ। ওই চাকরি পেলে তাকে আর কষ্ট করে কম্পিউটারের দোকানে কাজ করতে হত না। চিন্তা করতে হত না নিজের এবং ভাই দুটো লেখাপড়ার খরচ নিয়েও। আহা চাকরি, আজকালের বাজারে একটা সরকারি চাকরি কি মুখের কথা! এই চাকরির জন্য এই দেশের তরুণ তরুণীরা কত কষ্টই না করেন! আর রাজীবের কাছে সেই সুযোগ নিজেই এসেছিল। কিন্তু মৃত্যু তার সব স্বপ্ন আর হঠাৎ পাওয়া সুযোগটা কেড়ে নিল। এখন কি হবে তার ছোট ভাই দুটোর! তাদের দেখভালের জন্য পরিবারটির যে আর কেউ রইলো না।




পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলার বাঁশবাড়ি গ্রামের রাজীব তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ার সময় মা এবং অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় বাবাকে হারান। ঢাকার মতিঝিলে খালার বাসায় থেকে এসএসসি ও এইচএসসি পাস করে ভর্তি হন স্নাতকে। ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে পড়ুয়া দুই ভাইয়ের খরচ চালানোর জন্য পড়ালেখার ফাঁকে একটি কম্পিউটারের দোকানে কাজ করতেন। মৃত্যু তাকে তার সেই জীবন সংগ্রাম থেকে অব্যাহতি দিয়েছে। এখন আর বাসে উঠার জন্য কোনো ধস্তাধস্তি নেই, দেরি করে কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য উর্ধ্বতনের চোখ রাঙানি নেই, কলেজের বেতন কিংবা পরীক্ষার ফির অর্থ জোগাড়ের দুশ্চিন্তা নেই, বাসাভাড়ার জন্য বাড়িওয়ালার কাছে ধর্ণা দেয়া নেই। আসলে এক দিক দিয়ে দেখতে গেলে মৃত্যু রাজীবকে অনেক দিকে থেকেই বাঁচিয়ে দিয়েছে। কেবল একটাই কষ্ট হতভাগ্য রাজীবের চাকরিটা পাওয়া হল না।

কিন্তু এই দেশে এখনও যেসব রাজীবরা জীবন সংগ্রামে লিপ্ত আছেন তাদের কথা তো ভাবা যায়! সব ধরনের দলীয় সঙ্কীর্ণতার উর্ধ্বে ওঠে, কেবল ভালোবেসে, তাদের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য কিছু তো করা যায়। কিছু প্রতিশ্রুতি তো দেয়াই যায় অন্য সব রাজীবদের। আপাততঃ বাস দুর্ঘটনায় আর কোনো রাজীবকে এভাবে অকালে ঝড়ে যেতে হবে না এই নিশ্চয়তাটুকু পেলেই চলবে।

ad

পাঠকের মতামত