214885

কারা এভাবে তাণ্ডব চালাল ভিসির বাসভবনে?





নিউজ ডেস্ক।। রবিবার রাত প্রায় ১টা। মুখোশ ও হেলমেট পরিহিত কিছু তরুণ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামানের বাস ভবনের গেট ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে। এর পরেই এক বিভীষিকাময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তারা। মাত্র ১০ মিনিটের মধ্যে ল-ভ- করে দেওয়া হয় বাস ভবনের ভেতরটি। ভাঙচুরের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগ করা হয় পুরো বাস ভবনে। ফার্নিচার থেকে শুরু করে বাথরুমের কমোডও রেহাই পায়নি হামলাকারীদের হাত থেকে।

গতকাল সকালে ভিসির বাস ভবনে গিয়ে দেখা যায়, সাজানো-গোছানো বাড়িটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। অল্পের জন্য রক্ষা পান ভিসি ও তার পরিবারের সদস্যরা। প্রশ্ন উঠেছেÑ এই ভাঙচুর-অগ্নিংযোগ কারা চালাল। কোটাপদ্ধতি সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীরা বলছেনÑ এ ঘটনার সঙ্গে তাদের ন্যূনতম সংশ্লিষ্টতা নেই। সিসিটিভি ফুটেজ দেখে ভাঙচুরকারীদের বিচারও দাবি করেছেন তারা। হামলাকারীদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে মাঠে নেমেছে র্যাব, পুলিশসহ একাধিক সংস্থা। তারা গতকাল ভিসির বাস ভবনে থাকা সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাস ভবনে থাকা এক কর্মচারী জানান, রাত ১টার দিকে এক থেকে দুই হাজার বিক্ষোভকারী হঠাৎ বাস ভবনে প্রবেশ করে। তাদের মধ্যে অনেকেরই মুখোশ ও হেলমেট পরিহিত ছিল। তারা মূল গেট ভেঙে ফেলে এবং দেয়ালের তারকাঁটা ভেঙে বাসায় ঢুকে পড়ে। তাদের হাতে রড, হকিস্টিক, লাঠি ও বাঁশ ছিল। আমরা ভয়ে বাস ভবনের পেছনে পালিয়ে যাই। এর পরেই শুরু হয় ধ্বংসযজ্ঞ। এসি, টেলিভিশন, বিশ্ববিদ্যালয়ের জরুরি কাগজপত্র, চেয়ার-টেবিল, সোফাসেট, কাচের জিনিসপত্র, ফুলের টব, ছবিÑ সব কিছুই নির্বিচারে ভাঙচুর করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি উপাচার্য বাংলোর দোতলা থেকে আসবাবপত্র নিচে ফেলে আগুন ধরিয়ে উল্লাস করে হামলাকারীরা।

ঘটনার পর উপাচার্য বাংলোয় গিয়ে দেখা যায়, ভবনের সব রুমের মেঝেতে ছড়িয়ে রয়েছে কাচের টুকরো। নির্মম ধ্বংসযজ্ঞের চিহ্ন। গোটা বাড়ি তছনছ হয়ে রয়েছে। বিভিন্ন কাগজপত্র ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে এখানে-ওখানে। বাস ভবনের সামনের চত্বর থেকে দোতলা পর্যন্ত প্রায় সব কিছুই ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। গেটে প্রবেশ করার পর থেকে দুই পাশের চত্বরে বিভিন্ন প্রজাতির ফুল ও ফলের গাছ ভেঙে পড়ে রয়েছে। বাস ভবনের মূল ভবনের ভেতরে ও বাইরের সব আসবাবপত্রও হামলাকারীদের আক্রমণের শিকার হয়। বাস ভবনের সামনের অংশে থাকা কিছু চেয়ার-টেবিল থেকে সকালেও আগুনের ধোঁয়া বের হতে দেখা গেছে। ভাঙচুরকারীরা কেবল এতেই ক্ষান্ত হয়নি। তারা বাড়ির সামনের অংশে থাকা দুটি গাড়ি ভাঙচুর ও দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়।




এদিকে ঘটনার পর পরই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে উপাচার্য বাংলোতে আসেন।
উপাচার্যের স্ত্রী সালমা জামান সাংবাদিকদের জানান, রাতভর তা-বের প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুভয়ে কেটেছে। হামলার সময় মেয়েকে নিয়ে বাসার মধ্যেই লুকিয়ে ছিলাম। মেয়ে ভয়ে কাঁদছিল। তখন মেয়ের হাত শক্ত করে ধরেছিলাম। তা-বের প্রতিটি মুহূর্তে বারবার মৃত্যুভয়ে আঁতকে উঠেছি।

এদিকে ঘটনার প্রতক্ষ্যদর্শী বেশ কয়েকজন জানিয়েছেন, উপাচার্য বাংলোয় হামলার ঘটনায় বেশ কয়েকজন ছাত্রলীগের সক্রিয় নেতাকর্মীকে দেখা গেছে। এর মধ্যে ঢাকা কলেজের কয়েকজন শিক্ষার্থীও রয়েছেন। দীর্ঘ সময় ধরে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন চললেও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মধুর ক্যান্টিনে অবস্থান করে। তবে উপাচার্য ভবনে আগুন দেওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বাস ভবনে হাজির হয়। এ সময় ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির একজন সহসভাপতি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদককে উপাচার্য ভবনের অদূরে মল চত্বরে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেছে। তারা লাঠি হাতে সেখানে অবস্থান নেয়। ঘটনার সময় উপাচার্য ভবনের নিরাপত্তায় নিয়োজিত নিয়মিত অবস্থান করা পুলিশ সদস্যদেরও দেখা যায়নি।

এদিকে গতকাল সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে আন্দোলনকারীদের সংগঠন বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের নেতারা বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাস ভবনে যারা ভাঙচুর করেছে, তারা কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের কেউ নয়। অন্য কেউ এর সঙ্গে যুক্ত। সিসি ক্যামেরার ছবি দেখে তাদের চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেওয়া হোক।

সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. রাশেদ খান সাংবাদিকদের বলেন, ‘উপাচার্য মো. আখতারুজ্জামানের বাস ভবনে হামলাকারীরা আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত নন। তাদের আমরা চিনি না।’ তার দাবি, একজনকে বাস ভবনের বিভিন্ন স্থানে আগুন দিতে দেখা গেছে। যেহেতু উপাচার্যের বাস ভবনে সিসি ক্যামেরা আছে, তাই সেখান থেকে ফুটেজ নিয়ে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে শাস্তি দেওয়া উচিত।




পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, হামলার ধরন দেখে মনে হচ্ছে তারা প্রশিক্ষিত। পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ীই এ হামলা চালানো হয়েছে। তারা হামলার জন্য সন্দেহের তালিকায় রেখেছে জামায়াত-শিবির নেতাকর্মীদের।
গতকাল সকাল ৬টায় ঢাকার পুলিশ কমিশনার আছাদুজ্জামান মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, একাত্তর সালে পাকিস্তানিরাও ভিসির বাস ভবনে এভাবে হামলা করেনি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমাদের আবেগ ও সম্মানের জায়গা। কিন্তু আন্দোলনের নামে যারা তা-বলীলা চালিয়েছে, তারা সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে এ কাজ করেছে। আমরা হামলাকারীদের খুঁজে বের করব।

এদিকে বাস ভবনে ভাঙচুরের ঘটনার পর রবিবার রাতে উপাচার্যকে ফোন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। উপাচার্য ফোন ধরে প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, ‘আপা আমি ভীতিকর অবস্থায় আছি। পরিবারের বাকি সদস্যরা কোথায় জানি না। ঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী অপর প্রান্ত থেকে কিছু বলার পর উপাচার্য বলেন, ‘আপা বিষয়টি রাজনৈতিক। বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা যেত। এর পর ফোন করার জন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানান উপাচার্য। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উপাচার্যের পাঁচ মিনিটের মতো কথা হয়েছে বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।

ad

পাঠকের মতামত