213971

আরেক গৃহকর্মী এবার কার্লোসের রোষানলে





নিউজ ডেস্ক।। রাজধানীর পরীবাগে ধর্ষণে ব্যর্থ হয়ে ৭ তলা থেকে ফেলে গৃহকর্মীকে হত্যাচেষ্টার রেশ না কাটতেই আরও এক গৃহকর্মীকে নির্মম নির্যাতনের অভিযোগে উঠেছে সিনেমা প্রযোজক ও ইয়াবা ডন আবু সালেহ মোহাম্মদ ওরফে কার্লোস সালেহর (৪০) বিরুদ্ধে। গৃহকর্মীকে নির্যাতনের ঘটনার ৮ দিনেও ধরা পড়েননি কার্লোস। ঘটনার পরই তিনি বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে জানা গেছে।

কার্লোসের নির্যাতনের শিকার গৃহকর্মী মোসা. সমলা বেগমের (৪৫) অভিযোগ, গৃহকর্তার অস্বাভাবিক আচরণের কারণে চাকরি ছেড়ে চলে যেতে চাইলে সশস্ত্র দেহরক্ষী দিয়ে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় কার্লোসের বাসার নিচতলা থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। অমানুষিক নির্যাতনের পর সমলাকে ৬ ঘণ্টা আটকে রাখা হয় কার্লোসের বাথরুমে। চেয়ারের সঙ্গে হাত-পা বেঁধে, মুখে কাপড় গুঁজে বেধড়ক পেটানো হয়, বেজবলের ব্যাট দিয়ে শরীর থেঁতলানো ছাড়াও সুই দিয়ে খোঁচানো হয় হাতের আঙুলগুলো। ছুরিকাঘাত করা হয় কোমরে-হাতে। এ ছাড়াও গরম পানি ঢেলে ব্লিচিং পাউডার শরীরে ছিটিয়ে দেওয়া হয়। এত কিছুর পরও রেহাই মেলেনি। ঘটনা জানাজানির ভয়ে মধ্যরাতে কালো রঙের একটি গাড়িতে করে ভেজা শরীরেই অচেতন গৃহকর্মীকে ফেলে দেওয়া হয় রাস্তায়।
ঘটনার পর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন সমলা বেগম; কিন্তু অর্থাভাবে চিকিৎসা চালাতে অক্ষম হওয়ায় বাসায় ফিরতে হয়েছে। নির্যাতনের ফলে তার গলা-যৌনাঙ্গ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। ব্যথায় কাতরাচ্ছেন। ধারণা করা হচ্ছে, বেজবলের ব্যাটের আঘাতে ভেঙে গেছে তার পাঁজরের হাড়।

এদিকে অপকর্ম থেকে ছেলেকে বাঁচাতে বিভিন্ন স্থানে দৌড়-ঝাঁপ করছেন কার্লোসের বাবা বিএনপি নেতা মো. আবুল হোসেন। গতকাল দুপুরেও তাকে ভাটারার ছোলমাইদ এলাকায় গৃহকর্মী সমলা বেগমের বাসার অদূরে দেখা গেছে। ছেলের অপকর্মের বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার বিষয়ে তদবির করেছেন স্থানীয় প্রভাবশালী ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতার সঙ্গে। অথচ বাসার সামনে দিয়ে গেলেও গুরুতর আহত গৃহকর্মীকে দেখতে যাননি। ঘটনার পর পরই কার্লোস সালেহ ব্যাংকক পাড়ি জমিয়েছেন বলে সূত্র নিশ্চিত করেছে।
এই ঘটনায় গত ২৯ মার্চ দিনগত গভীর রাতে রাজধানীর ভাটারা থানায় লিখিতভাবে অভিযোগ জানিয়েছেন সমলা বেগমের ছেলে মো. রুবেল মিয়া। তার মৌখিক বক্তব্য সেদিন লিখে দিয়েছিলেন ভাটারা থানার এসআই মহিউদ্দিন মহি। তিনি ঘটনাস্থল পরিদর্শনও করেছেন বলে জানিয়েছেন কার্লোসের বসুন্ধরার সি-ব্লকের ২ নম্বর সড়কের ভবনের বাসিন্দারা; কিন্তু ঘটনার ৮ দিনেও অভিযোগটি এজাহার হিসেবে গ্রহণ করেনি থানাপুলিশ। উপরন্তু গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় ভাটারা থানার ওসি এসএম কামরুজ্জামান জানালেন, এই বিষয়ে তিনি অবগতই নন!




অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে কার্লোসের বাবা মো. আবুল হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, পরীবাগের ওই ঘটনার পর থেকে আবু মো. সালেহ সপরিবারে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ভাড়া থাকছেন। সালেহর হাতে কোনো গৃহকর্মী নির্যাতনের শিকার হয়েছেনÑ এই তথ্য অসত্য। কেউ ভুল তথ্য দিয়ে তার ছেলের সম্মানহানির চেষ্টা করছেন বলেও দাবি করেন কার্লোসের বাবা।
গতকাল দুপুরে ভাটারার ছোলমাইদে গৃহকর্মী সমলা বেগমের বাসায় গিয়ে দেখা গেছে, বিছানায় শুয়ে আছেন। পাশেই অসহায়ের মতো দাঁড়িয়েছিলেন তার স্বামী মো. নজরুল ও ছেলে রুবেল। কিছু একটা বলতে গিয়েও বলতে পারলেন না সমলা বেগম। ব্যথায় বার বার কুঁকড়ে উঠছেন।

ঘটনার বর্ণনায় রুবেল বলেন, মাসিক ৯ হাজার টাকার চুক্তিতে গত ২৫ মার্চ কার্লোস সালেহর বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেন তার মা। কাজে যোগদানের দ্বিতীয় দিন কার্লোস ও তার স্ত্রীর মধ্যে ঝগড়া হয়। স্ত্রীকে বেধড়ক মারধর করছিলেন কার্লোস। ঝগড়ার একপর্যায়ে ছুরি দিয়ে তিনি হাত কেটে দেন স্ত্রীর। প্রাণ বাঁচাতে ওই সময় তার স্ত্রী দৌড়ে ওই ভবনেরই আরেকটি ফ্লাটে আশ্রয় নেন। ঘটনার দিন (গত ২৯ মার্চ) কার্লোস তার স্ত্রীকে ওই বাসা থেকে ডেকে আনার কথা বলেন সমলা বেগমকে। সায় না দিয়ে সমলা বেগম কাজ ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্তের কথা জানান কর্লোসকে। লিফটের নিচতলায় এসে দরজা খুলতেই কর্লোসের দেহরক্ষী একটি গামছা দিয়ে সমলার মুখ বেঁধে কার্লোসের ঘরে নিয়ে যায়। কার্লোস সমলার গলা টিপে ধরে শূন্যে তুলে ছুড়ে মারেন আলমারির সঙ্গে। পেটে-যৌনাঙ্গে লাথি মারছিলেন অবিরত। একপর্যায়ে মাটিতে শুইয়ে গলায় পাড়া দিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লে অনবরত রক্ত ঝড়ছিল সমলার মুখ বেয়ে। পরে চেয়ারের সঙ্গে বেঁধে ফেলা হয় হাত-পা। বেজবলের ব্যাট দিয়ে শরীরের বিভিন্ন স্থানে পেটাতে থাকেন। পানি চেয়েও না পেয়ে একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন সমলা। পরে তাকে নিয়ে বাথরুমে ফেলে শরীরে ঢেলে দেওয়া হয় গরম পানি ও ব্লিচিং পাউডার। এখানেও মারধর করা হয়; আটকে রাখা হয় ৬ ঘণ্টার মতো।

রুবেল আরও বলেন, সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলেও মা ফিরে না আসায় তিনি স্থানীয় কয়েকজন নিয়ে কার্লোসের বাড়িতে যান। তখন নিরাপত্তাকর্মীরা বলেন তার মা চলে গেছেন। এ সময় চিৎকার করে মা-মা বলে ডাকেন রুবেল; কিন্তু সাড়া মেলেনি।
পরে রাত ১১টার দিকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় অবস্থিত এ্যাপোলো হাসপাতালের দক্ষিণ গেটে একটি কালো রঙের গাড়িতে এনে তার মাকে ফেলে দিয়ে যান কার্লোস ও তার দেহরক্ষী। ভেজা শরীরে রাস্তায় অচেতন অবস্থায় সমলা বেগম পড়েছিলেন আধাঘণ্টার মতো। পরে স্থানীয়রা সমলাকে নিয়ে যান কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালে। এই বিষয়ে রাতেই তারা থানায় লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন বলেও রুবেল জানান।




জানা গেছে, কার্লোস শুধু ইয়াবা ডনই নন, স্বর্ণ চোরাচালানের গডফাদারও। বাংলাদেশের বড় বড় স্বর্ণ চোরাচালান মামলায় যে কজন বাংলাদেশি গডফাদারের নাম এসেছে, তাদের মধ্যে কার্লোসও রয়েছেন। ২০১৩ সালের ২৪ জুলাই হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশ বিমানের বিজি ৭০২ ফ্লাইটে ১২৪ কেজি স্বর্ণের চালান উদ্ধারের ঘটনায় করা বিশেষ ক্ষমতা আইনের মামলায় ডিবি পুলিশের এক সহকারী কমিশনার ১৮ জনকে আসামি করে চার্জশিট দাখিল করেন। এতে বিমানের বেশ কয়েক কর্মকর্তা ও কর্মচারী, এক বিদেশি নাগরিক ও কয়েক ব্যবসায়ীকে অভিযুক্ত করা হয়। ওই ব্যবসায়ীদের মধ্যেও সালেহ আহম্মেদ খান (এজেডএম সালেহ আহম্মেদ (৩৫) ওরফে কার্লোস) রয়েছেন। স্বর্ণগুলো তাদের (ব্যবসায়ী) জন্যই আনা হয়েছিল বলে চার্জশিটে উল্লেখ করা হয়। আদালতের নির্দেশে মামলাটি বর্তমানে পুনঃতদন্তাধীন রয়েছে।

সালেহ আহমেদ ২০১৪ সালে র্যাবের হাতেও একবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। অবৈধ মুদ্রা ও হুন্ডি ব্যবসা, মাদক ব্যবসা এবং নিজ গাড়িতে জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম ব্যবহার করার অপরাধে তাকে গ্রেপ্তার করে র্যাব। পরীবাগে গৃহকর্মীকে ভবন থেকে ফেলে দেওয়ার ঘটনার পর র্যাব ৩-এর একটি দল শাহবাগের পরীবাগ এলাকায় অবস্থিত দিগন্ত টাওয়ারের পার্কিং-২ থেকে জাতীয় সংসদের মনোগ্রাম লাগানো একটি নতুন মডেলের ঐণটঘউঅও-ঐ১ মাইক্রোবাস (রেজি. নং-ঢাকা মেট্রো-চ-১৫-৫৫০৬) উদ্ধার করে। উৎস: দৈনিক আমাদের সময়।

ad

পাঠকের মতামত