211721

প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে ৯ বছর ধরে আত্মগোপনে জালাল

কিশোরগঞ্জের হোসেনপুর উপজেলার গোবিন্দপুর ইউনিয়নের উত্তর লাকুহাটি গ্রামের জালাল উদ্দিনকে কেউ অপহরণ করেনি। তিনি নিজেই প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে দীর্ঘ ৯ বছর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা উপজেলার খাড়েরা ইউনিয়নে ‘পালিয়ে’ ছিলেন। এ সময়টাতে তিনি সেখানে কাঠ ও লাকড়ির ব্যবসা করতেন। জালাল সর্বশেষ ওই গ্রামের হাজি হেলো মিয়ার বাসায় ভাড়া থাকতেন। তাঁর স্ত্রী ললিতা বেগমও মাঝেমধ্যে খাড়েরা গ্রামে যেতেন। খাড়েরা বাজার কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম ও সেক্রেটারি মো. জহিরুল হক এসব তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

জালালকে অপহরণ ও খুনের অভিযোগে করা মামলাটি আদালতের আদেশে আবার তদন্ত করছে পুলিশ।

জানতে চাইলে হোসেনপুর সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) আরাফাতুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, জালালকে কেউ অপহরণ করেনি। তিনি নিজেই কসবায় একটি গ্রামে আত্মগোপন করেছিলেন। সেখানে তিনি কাঠের ব্যবসা করতেন। এ তথ্যগুলো সত্য হলে মামলার বাদী ও জালালের বিরুদ্ধে উল্টো মামলা করা হবে।

সম্প্রতি জালালের সঙ্গে এসব বিষয়ে কথা বলতে তাঁর বাড়িতে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। কথা বলতেও রাজি হয়নি তাঁর পরিবারের লোকজন।

ব্যবসা করতেন জালাল : খাড়েরা বাজার কমিটির সভাপতি মো. আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার একটি দোকানঘর ভাড়া নিয়ে জালাল সেখানে ব্যবসা করত। সে চলে যাওয়ায় দুই মাস ধরে দোকানটি বন্ধ রয়েছে। আমরা তাকে সুস্থ শরীরে খাড়েরা বাজারে ব্যবসা করতে দেখেছি। তার আচরণেও কোনো অস্বাভাবিকতা দেখতে পাইনি। সে যে এলাকার লোকজনকে ফাঁসিয়ে খাড়েরা বাজারে আস্তানা গেড়েছে, এটা আমাদের জানা ছিল না।’

খাড়েরা গ্রামের বাসিন্দা মো. শিপন মিয়া বলেন, ‘জালালের সঙ্গে সুসম্পর্কের সুবাদে চার-পাঁচ মাস আগে আমার কাছে তার পালিয়ে থাকা ও মামলা-মোকদ্দমাসহ সব কিছু খুলে বলে। শেষের দিকে সে খুব কান্নাকাটি করেছে। আমি তাকে বাড়িতে ফিরে গিয়ে সব কিছুর সমাধান করতে পরামর্শ দিই।’

খাড়েরা বাজারে ইউনিয়ন পরিষদের সামনে চালের ব্যবসা করেন মো. আমির মিয়া। তিনি বলেন, ‘জালাল কাঠ ও লাকড়ির ব্যবসা করে বিগত দিনগুলোতে আট থেকে ১০ লাখ টাকা আয় করেছে। যাওয়ার সময় নগদ অন্তত দু-তিন লাখ টাকা নিয়ে গেছে। সে চলে যাওয়ার পর পুরো ঘটনা বিভিন্ন মিডিয়া থেকে জানতে পারি।’

আমির মিয়া আরো বলেন, ‘আমার সঙ্গে জালালের প্রায়ই কথা হতো। তার স্ত্রীকেও একদিন তার সঙ্গে দেখেছিলাম আমি।’

জালালের দুই রকম জবানবন্দি : গত ১৫ জানুয়ারি কিশোরগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে হঠাৎ হাজির হন এবং আইনজীবীর মাধ্যমে জবানবন্দি দেন। লিখিত জবানবন্দিতে তিনি যা দাবি করেছেন, তা ‘সঠিক’ নয় বলে জানিয়েছে খাড়েরা বাজার কমিটির লোকজন। ওই জবানবন্দিতে তিনি বলেছেন, সৌদি আরবে যাওয়ার জন্য আসামিদের তিনি ২৫ লাখ টাকা দিয়েছিলেন। পরে আসামি আজহারুল ইসলাম, রুহুল আমিন ওরফে রঙ্গু মিয়া ও হিরা মিয়া তাঁকে নিয়ে ঢাকায় যান। ঢাকার চিটাগাং রোডে গিয়ে অন্য আসামি শঙ্কর বাবু ও আসাদ মল্লিকের কাছে তাঁকে রেখে যান তাঁরা। পরে তাঁকে বিদেশ না পাঠিয়ে বিভিন্ন কৌশলে আটকে রাখেন এবং চেতনানাশক প্রয়োগ করে অচেতন করে রাখেন। একপর্যায়ে সুযোগ বুঝে সেখান থেকে তিনি পালিয়ে যান এবং মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন। দীর্ঘদিন দেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘোরাঘুরি করে সর্বশেষ এক মাস আগে (ডিসেম্বর) কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে উঠলে তিনি নিজেকে মুন্সীগঞ্জের বিক্রমপুরে আবিষ্কার করেন। তখন স্ত্রী, সন্তান ও বাড়ির কথা মনে হলে অনেক কষ্টে বাড়ি ফেরেন তিনি।

জজ আদালতের নির্দেশে বর্তমানে মামলাটি আবার তদন্ত করা হচ্ছে। তদন্ত শুরু হওয়ার পর জালাল আবার নিম্ন আদালতে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেন। আদালত সূত্রে জানা গেছে, এ জবানবন্দিতে তিনি আর ২৫ লাখ টাকার কথা বলেননি। বলেছেন, বিদেশে যেতে তিনি আড়াই লাখ টাকা দিয়েছেন এবং ৮৫ দিন তাঁকে নানা অজুহাতে আটকে রাখেন আদম ব্যবসায়ী শঙ্কর। পরে তাঁকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেন। এরপর আবার দু-এক দিন পর তিন আসামি আজহার, হিরা ও রঙ্গু মিয়া তাঁকে শঙ্করের কাছে নিয়ে যান। এর পরের ঘটনা তাঁর আর মনে নেই। কিছুটা সুস্থ হয়ে উঠলে তিনি বিক্রমপুর থেকে বাড়িতে আসেন।

ঘটনার পেছনের ঘটনা : একটি সূত্র জানায়, কসবার খাড়েরায় থাকা অবস্থায় জালালের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীর বিরোধ তৈরি হয়। তাঁর স্ত্রীর কাছে খবর আসে, তিনি আরেকটি বিয়ে করেছেন। এ খবর শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে জালালকে ফিরে আসতে চাপ দিতে থাকেন স্ত্রী ললিতা বেগম। এভাবে একপর্যায়ে এলাকায় ফিরতে বাধ্য হন জালাল। তবে জালালের দ্বিতীয় বিয়ের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি খাড়েরার লোকজন।

জানা গেছে, জালাল এলাকায় ভাঙ্গারি ব্যবসা করতেন। তাঁকে বিদেশে নেওয়ার কথাবার্তা চলছিল শঙ্করের সঙ্গে। বিদেশে যাওয়া বাবদ ৫০ হাজার টাকা এক আদম ব্যবসায়ীকে দিয়েছিলেন জালাল। পরে বাকি টাকা পরিশোধ হয়নি বলে তাঁর বিদেশ যাওয়া হয়নি। এ সমস্যা থেকে তৈরি হওয়া বিরোধের সুযোগ নেয় তৃতীয় পক্ষ।

লাকুহাটি গ্রামের কয়েকজন নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, জালালের স্ত্রী ললিতাকে চক্রটি বড় কোনো লোভ দেখিয়েছিল। লোভে পড়ে হয়তো তিনি তাঁর স্বামীকে অজ্ঞাত স্থানে পাঠিয়ে দিয়ে ‘অপহরণ ও হত্যা’ মামলাটি করেন।

জালালের স্ত্রী ললিতা যে পাঁচজনকে ‘অপহরণ ও খুনের’ আসামি করেছিলেন, তাদের অন্তত তিনজন এলাকার প্রভাবশালীদের চক্ষুশূল হয়ে পড়েছিল। ওই প্রভাবশালীদের ‘কুপরামর্শ’, ‘ইন্ধন’ ও ‘সহযোগিতা’র ফলাফলই এই মামলা। মামলায় যাঁরা সাক্ষী হয়েছিলেন তাঁরাও কোনো না কোনোভাবে লাভবান হয়েছেন এ ঘটনা ও মামলা থেকে। স্থানীয় লোকজনের মতে, জালালকে নিয়ে যা হলো, তার সবটাই ‘পরিকল্পিত’ ও ‘সাজানো’ ঘটনা।

একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়, নেপথ্যে থেকে পুরো ঘটনার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তখনকার গোবিন্দপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম মাস্টার। তিনি বর্তমানে স্থানীয় লাকুহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক।

বিষয়টি নিয়ে গত রবিবার মোবাইল ফোনে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের যোগাযোগ বা সম্পৃক্ততা ছিল না দাবি করেন। হাসতে হাসতে তিনি বলেন, ‘আমি ওই সময় চেয়ারম্যান ছিলাম ঠিকই কিন্তু বিষয়টি আমি জানতাম না। আমি মামলার ব্যাপারেও কিছু জানি না। শুনছি, জালাল নিখোঁজ হয়েছে। দীর্ঘদিন পরে আমি জানতে পারি, এ ঘটনায় মামলা হয়েছে। ইদানীং হঠাৎ করে জালাল স্ত্রী নিয়ে আমার বাসায় আসে। এসে জালালের ফিরে আসার বিষয়টি আমাকে জানিয়ে করণীয় বিষয়ে পরামর্শ চায়। আসলে আমার নামে যে-ই এই অভিযোগ তুলুক না কেন, তা একেবারে মিথ্যা; এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই।’

সূত্র জানায়, বর্তমানে মামলার বাদী ললিতা বেগম মামলাটি আপস-মীমাংসার জন্য এলাকায় দৌড়ঝাঁপ করছেন।

মামলা পুনঃ তদন্তের অগ্রগতি : উত্তর লাকুহাটি গ্রামের মফিজ উদ্দিনের ছেলে মো. জালাল উদ্দিন গত ২০০৯ সালের ১০ জুলাই নিখোঁজ হন। এর আট মাস পর ২০১০ সালের ৩১ মার্চ অপহরণ ও খুনসহ লাশ গুমের অভিযোগে তাঁর স্ত্রী হোসেনপুর থানায় পাঁচজনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলার আসামিরা হলেন পাশের গাঙ্গাটিয়া গ্রামের শঙ্কর সূত্রধর, সৈয়দপুর গ্রামের রহমতউল্লাহ মল্লিকের ছেলে মো. আসাদ মল্লিক, একই গ্রামের আব্দুল ব্যাপারীর ছেলে আজহারুল ইসলাম, গাঙ্গাটিয়া গ্রামের মুর্শেদ আলীর ছেলে রুহুল আমিন ওরফে রঙ্গু ও হরিচন্দ্র পট্টির জজের বাপের ছেলে হিরা মিয়া। ২০১৫ সালের ৯ মে আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করে পুলিশ। এ সময়ে মামলাটি পাঁচজন তদন্ত কর্মকর্তা তদন্ত করেন। সর্বশেষ তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন জেলা গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) উপপরিদর্শক মোহাম্মদ মুর্শেদ জামান। অভিযোগপত্রে বলা হয়, তথ্য-প্রমাণ না পাওয়ায় জালালকে হত্যা করা হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তবে আসামিরা জালালকে যে অপহরণ করেছেন, তা প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে কিশোরগঞ্জ আদালত ও দুর্নীতি দমন কমিশনের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুর রহমান বলেন, “এ ধরনের ‘মিথ্যা ও সাজানো’ একটি মামলায় পুলিশের কোনোভাবেই অভিযোগপত্র দেওয়া উচিত হয়নি।”

মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা হোসেনপুর থানার ওসি (তদন্ত) খুর্শেদ আলম বলেন, ‘যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে। এখন শুধু যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। এগুলো শেষ করেই আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করা হবে। আশা করি, নির্দোষ কেউ ক্ষতিগ্রস্ত হবে না।’

৯ বছর পর জালালের ফিরে আসা নিয়ে গত ১৭ জানুয়ারি কালের কণ্ঠে ‘অপহরণ ও খুন’ হওয়ার ৯ বছর পর আদালতে! শিরোনামে একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। এরপর ১৯ জানুয়ারি একই বিষয়ে ‘এক পরিবার দেশছাড়া, বহু পরিবার সর্বস্বান্ত’ এবং ২২ জানুয়ারি ‘নতুন ষড়যন্ত্রের আশঙ্কা করছে ভুক্তভোগীরা’ শিরোনামে আরো দুটি প্রতিবেদন ছাপা হয়।

ad

পাঠকের মতামত