209620

টাকা ছাড়াই পুলিশে ১২৫ তরুণ-তরুণী

বিনা টাকায় পুলিশ কনস্টেবল পদে চাকরি পেয়েছেন ১২৫ তরুণ-তরুণী। তাঁদের বেশির ভাগ দরিদ্র পরিবারের। হবিগঞ্জে এবার এমন ঘটনা ঘটেছে। এমনকি এদের মধ্যে এমন প্রার্থীও চাকরি পেয়েছেন যাঁদের মেডিক্যাল পরীক্ষা করার টাকা দেওয়ারও সামর্থ্য নেই। হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরার হস্তক্ষেপে সেই টাকাও দিতে হয়নি।

হবিগঞ্জের চা শ্রমিক, কৃষক, জেলেসহ সব শ্রেণির লোকজন কোনো তদবির ছাড়াই পুলিশে চাকরি পেয়েছেন। চুনারুঘাট উপজেলার দেউন্দি চা বাগানের শ্রমিক নিরঞ্জন ভৌমিকের ছেলে বসন্ত ভৌমিকও চাকরি পেয়েছেন।

এ খবর চা বাগানে ছড়িয়ে পড়লে পুরো বাগানেই উৎসবের আমেজ তৈরি হয়।

বাগানের বিশিষ্ট নাট্যকার ও প্রতীক থিয়েটারের সভাপতি সুনীল রায় বলেন, ‘শ্রমিকরা অতিকষ্টে সন্তানদের লেখাপড়া করান; কিন্তু তাদের জন্য চাকরির ক্ষেত্রে কোনো কোটা নেই। তার পরেও পুলিশে একজন শ্রমিকের সন্তান মেধাভিত্তিতে চাকরি পাওয়ায় অন্যরাও সন্তানদের লেখাপড়া করাতে উৎসাহী হবেন।’

বানিয়াচং উপজলার যাত্রাপাশ গ্রামের ছাবু মিয়ার ছেলে জসিম মিয়া। বাবার সঙ্গে অন্যের জমিতে শ্রমিকের কাজ করেন তিনি। এর ফাঁকে লেখাপড়াও চালিয়ে যান। পুলিশে লোক নেবে জানতে পেরে তিনিও আবেদন করেন। এখন চাকরি নামের সোনার হরিণের সন্ধান পেয়ে আপ্লুত। এখন তাঁর স্বপ্ন এ চাকরির মাধ্যমে পরিবারের আর্থিক সংকট দূর করবেন। পাশাপাশি দেশ সেবায় নিজেকে নিয়োজিত করবেন।

ওই এলাকার চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবলীগের সভাপতি রেখাছ মিয়া বলেন, ‘জসিমের মতো দরিদ্র পরিবারের সন্তান চাকরি পাওয়ায় সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে। মানুষ এখন বিশ্বাস করবে টাকা ছাড়াও সরকারি চাকরি পাওয়া যায়।’

হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার প্রত্যন্ত এলাকা ছয়শ্রী গ্রামের বাসিন্দা রবীন্দ্র সিংহ। বাবা প্রতিবন্ধী প্রফুল্ল সিংহ কোনো কাজ করতে পারেন না। মা সন্ধ্যা সিংহ কোনোভাবে টেনেটুনে সংসার চালান। খুব কষ্টে রবীন্দ্র সিংহ লেখাপড়া করেন। টাকার অভাবে চাকরি হবে না জেনেও আবেদন করেন পুলিশে। পরীক্ষায় ভালো করায় চাকরির জন্য মনোনীত হন তিনি। প্রথমে যখন এ খবর পান বিশ্বাস করেননি। পরে নিয়োগ বোর্ড থেকে মেডিক্যাল পরীক্ষা করানোর জন্য অনুরোধ করা হয়। এর জন্য খরচ প্রায় তিন হাজার টাকা। এত টাকা কোথায় পাবেন তা ভেবে অস্থির হন রবীন্দ্র সিংহ। ঋণ করতেও সাহস পাচ্ছিলেন না। কারণ চাকরি না পেলে ঋণ পরিশোধও করতে পারবেন না। তাঁর এ করুণ অবস্থার কথা জানতে পেরে হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা বিনা খরচে তাঁর মেডিক্যাল পরীক্ষার ব্যবস্থা করেন। এতে চাকরি পাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয় রবীন্দ্র সিংহের।

এখন তিনি তাঁর প্রতিবন্ধী বাবার চিকিৎসা করাতে পারবেন, মায়ের মুখে হাসি ফোটাতে পারবেন—এ আনন্দে তিনি আত্মহারা। রবীন্দ্র সিংহ বলেন, ‘আমি আত্মীয়-স্বজনকে চাকরি হওয়ার সুখবরটি দিলে প্রথমে অনেকেই জানতে চান, এত টাকা কোথায় পেলাম? পরে সবাই বুঝতে পারেন আমি বিনা টাকায় চাকরি পেয়েছি।’

হবিগঞ্জের পুলিশ সুপার বিধান ত্রিপুরা বলেন, ‘আমি যখন মানিকগঞ্জে পুলিশ সুপার ছিলাম তখনো মেধাভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছিলাম। এতে দরিদ্র ও কৃষকের সন্তানরা চাকরি পায়। হবিগঞ্জেও আমি একই কৌশল নিয়েছি। এতে শতভাগ সফলও হয়েছি। নিয়োগ কাজে সব কর্মকর্তারা আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন। কোনো দালালচক্রের উদ্ভব হতে দেওয়া হয়নি। টাকার চেয়ে স্বচ্ছ কাজের মাধ্যমে দরিদ্র মানুষের হাসির মূল্য আমার কাছে অনেক বড়। তাই নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা হয়েছে।’

হবিগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আ স ম সামছুর রহমান ভূঁইয়া বলেন, ‘জঙ্গি, সন্ত্রাস ও মাদক প্রতিরোধ গড়ুন, বাংলাদেশ পুলিশে যোগদিন’ স্লোগান নিয়ে সারা জেলায় ব্যাপক প্রচার কার্যক্রম চালায় জেলা পুলিশ প্রশাসন। সতর্ক করা হয় দালাল ও প্রতারকচক্র থেকে সাবধান থাকার জন্য। এ প্রচারের ফলে পুলিশের চাকরি নিতে মাঠে হাজির হয় রেকর্ড সাড়ে চার হাজার প্রার্থী।

‘শারীরিক যোগ্যতা পরীক্ষার পর কৃতকার্য হয় এক হাজার ১১৮ জন। লিখিত পরীক্ষায় প্রায় ৩০০ জন কৃতকার্য হয়। ভাইভার পর সেখান থেকে ১৪২ জনের তালিকা করা হয়েছে। এদের অনেকেরই এখনো মেডিক্যাল পরীক্ষা ও ভেরিফিকেশন চলছে। এর মধ্য থেকে ১২৫ জন নিয়োগ পাবে। অন্যদের অপেক্ষমাণ তালিকায় রাখা হবে। আগামীকাল বৃহস্পতিবার চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা হবে।’

তিনি আরো জানান, ড্রাগ টেস্টসহ বিভিন্ন মেডিক্যাল পরীক্ষায় পাঁচ হাজার টাকার মতো খরচ হতো। হবিগঞ্জ শহরের চাঁদের হাসি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ করে তা কমিয়ে এনে তিন হাজার টাকা করা হয়েছে। আর যাদের এ টাকা দেওয়ারও সামর্থ্য নেই তাদের বিনা টাকায় পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়।

ad

পাঠকের মতামত