বিদেশে বাংলাদেশকে তুলে ধরছেন আট দূত
ডেস্ক রিপোর্ট : নারী-পুরুষে ভেদাভেদ নয়। নারীকে আবদ্ধ রেখে এই সমাজ-সভ্যতার বিকাশ, অগ্রগতিও সম্ভব নয়। যুগে যুগে মহীয়সী নারীরা সে প্রমাণ দিয়েছেন। সমাজ, রাষ্ট্রের বড় সংকটে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনে সফলতার স্বাক্ষর রেখেছেন। বর্তমানে বাংলাদেশের কূটনৈতিক অগ্রযাত্রায় বড় ভুমিকা রেখে চলেছেন নারীরা। পুরুষ সহকর্মীর সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে তারা বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন। কূটনীতির মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় সুনামের সঙ্গে কাজ করছেন তারা। বর্তমানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এবং সংস্থায় রাষ্ট্রদূত হিসেবে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব করছেন আট নারী। এই সংখ্যা অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। যা দেশে নারী ক্ষমতায়নের এক বিরাট প্রতিফলনও।
স্বাধীনতার পর সব ধরনের বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করে নারী কূটনীতিকরা সুস্থিরভাবে এগিয়ে চলেছেন। যদিও পররাষ্ট্র সার্ভিসে আনুপাতিক হারে এখনো পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা কম। দেশে তিন শতাধিক কূটনীতিকের মধ্যে নারী রয়েছেন ৬৬ জন। যা মোট কর্মকর্তাদের প্রায় ২০ শতাংশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ১৪৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে ৩৯ জন নারী। তারপরও ১৯৭৯ সালে পররাষ্ট্র সার্ভিসে প্রথমবারের মতো নারী কূটনীতিকের অন্তর্ভুক্তির তিন দশক পর দৃশ্যপট পুরোপুরি বদলে গেছে। আর কূটনীতির মতো চ্যালেঞ্জিং পেশায় নারীরা পুরুষের চেয়ে দক্ষতা ও মেধায় পিছিয়ে আছে এমনটা বলারও এখন কোনো অবকাশ নেই।
বর্তমানে তিন মহাদেশ- এশিয়া, ইউরোপ ও আফ্রিকায় সাতজন নারী রাষ্ট্রদূত দায়িত্ব পালন করছেন। আর একজন বাংলাদেশি নারী কূটনীতিক ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সদর দপ্তরে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) দূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিদেশে বাংলাদেশের ৫৮টি মিশনে দায়িত্ব পালন করছেন রাষ্ট্রদূত/হাইকমিশনাররা। এর মধ্যে প্রায় ৩০ শতাংশ কূটনীতিকই পররাষ্ট্র সার্ভিস ক্যাডারের বাইরের। তবে নারী রাষ্ট্রদূতদের সবাই পেশাদার কূটনীতিক। রাষ্ট্রদূত ছাড়াও অনেক নারী বিদেশি মিশনগুলোর গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন।
বর্তমানে দায়িত্বরত নারী রাষ্ট্রদূতদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হলেন রাষ্ট্রদূত ইসমাত জাহান। বিসিএস পররাষ্ট্র ক্যাডারের ১৯৮২ ব্যাচের এ কর্মকর্তা বেলজিয়াম ও ইউরোপীয় ইউনিয়নে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে ছুটি (লিয়েন) নিয়ে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) সদর দপ্তরে ইসলামী সহযোগিতা সংস্থার (ওআইসি) রাষ্ট্রদূত হিসেবে কাজ করছেন।
বর্তমানে জাপানে রাবাব ফাতিমা, মরক্কোয় সুলতানা লায়লা, নেপালে মাশফি বিনতে শামস, থাইল্যান্ডে সাইদা মুনা তাসনিম, দক্ষিণ কোরিয়ায় আবিদা ইসলাম এবং ভিয়েতনামে সামিনা নাজ রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে ইতালির মিলানের কনসাল জেনারেল রেজিনা আহমেদকে ইতিমধ্যে মরিশাসের হাইকমিশনার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। শিগগিরই সংশ্লিষ্ট দেশের অনুমোদনের মাধ্যমে তার আনুষ্ঠানিক নিয়োগের ঘোষণা আসবে।
১৯৭৯ সালে বাংলাদেশে পররাষ্ট্র সার্ভিস ক্যাডার থেকে প্রথম নারী কূটনীতিক হিসেবে যোগ দেন নাসিম ফেরদৌস। ২০০২ সালে তিনি ইন্দোনেশিয়ার রাষ্ট্রদূত হন। তার পর এক এক করে নাসিমা হায়দার, সেলিনা মোহসিন এবং মাজেদা রফিকুন্নেসা রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিভিন্ন দেশে দায়িত্ব পালন করেছেন। তবে পেশাদার কূটনীতিক না হয়েও বাংলাদেশের প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত হন মাহমুদা হক চৌধুরী। তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ভুটানে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।
একবার বিবিসি’কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে সাবেক রাষ্ট্রদূত নাসিম ফেরদৌস নারী কূটনীতিকের চ্যালেঞ্জ নিয়ে কথা বলেন। তিনি বলেন, যখন প্রথম বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে যোগ দেই, তখন ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার মন্তব্যে বিস্মিত হয়েছিলাম। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা আমাকে বলেছিলেন, আপনি কেন এসেছেন একজন পুরুষের জায়গা নষ্ট করতে? আপনি না আসলে তো একজন পুরুষ সুযোগ পেত। আপনি তো বিয়ে করার পর বাচ্চা হলে আর অফিসে আসবেন না, তখন জায়গাটা নষ্ট হবে। ঊর্ধ্বতন সেই কর্মকর্তার কথা ভুল প্রমাণিত করে তিনি রাষ্ট্রদূত হয়েছিলেন। তার কথায়, আমি যখন চাকরিতে যোগ দেই তখন আমার মনে হয়েছিলো আমি একটি কাঁচের বাক্সে ঢুকে পড়েছিলাম। এই কাঁচের বাক্স ভেঙে সমতা নিয়ে আসা বা বর্তমান পর্যায়ে আসা ছিল? খুবই বড় চ্যালেঞ্জ।
ভিয়েতনামে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত সামিনা নাজ বলেন, আমার দেশের একজন রাষ্ট্রদূত হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারায় আমি সম্মানিত বোধ করি। আমি নিজেকে কখনোই একজন নারী রাষ্ট্রদূত হিসেবে বিবেচনা করি না। বরং যেকোনো দায়িত্ব পালনকালে আমি নিজেকে একজন কর্মকর্তা হিসেবেই বিবেচনা করি। নারী কূটনীতিকরা পরিবারের রক্ষণাবেক্ষণের পর অফিসের দায়িত্ব একজন পুরুষ সহকর্মীর মতোই পালন করে থাকে। ইত্তেফাক




