202060

পুলিশের চাঁদাবাজি মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে

নিউজ ডেস্ক।।

‘আরে ভাই আমাদের ধরবে কেন? পুলিশকে প্রতিমাসে দিতে হয় আড়াই লাখ টাকা। টাকা দিয়ে মুখ বন্ধ রাখা লাগবে।’ ঠিক এভাবেই বললেন এক মাদক চোরাচালানকারি। একটি কথোপকথন রেকর্ডে ধরা পড়ে এমন চিত্র। প্রতিবেদকের উপস্থিতিতেই কথাগুলো বললেন তিনি। এ সময় স্থানীয় পুলিশের কয়েকজন সোর্স সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তারাও মাথা নেড়ে সায় দিলেন এ কথায়।

কুমিল্লা জেলায় মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কয়েকজন অসৎ পুলিশ কর্মকর্তার এমন সখ্য অনেকটাই যেন ওপেন সিক্রেট। সাধারণ মানুষ সব জানলেও ভয়ে মুখ খুলতে চায় না। এ ছাড়া মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে চাঁদাবাজিতেও পিছিয়ে নেই ওই পুলিশ কর্তারা।

এদিকে সীমান্তের নিরাপত্তায় নিয়োজিত বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) কয়েকজন অসাধু সদস্যও যোগাযোগ রাখেন মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে। সীমান্ত এলাকায় আটক চোরাচালানের একটি অংশ বাইরে বিক্রি করে দিচ্ছেন তারা। এ ক্ষেত্রে তাদের প্রধান হাতিয়ার স্থানীয় সোর্স।

গত রবিবার দুপুরে বিজিবির এমন কর্মকা-ের সরেজমিনে দেখতে এই প্রতিবেদক কুমিল্লা সদরের গোলাবাড়ির তালতলা সীমান্তে পৌঁছান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, কুমিল্লা শহর থেকে অনেকেই মাদক সেবন ও ক্রয়ের জন্য সেখানে গেছেন। কিন্তু ওইদিন সীমান্তের ওপারে ভারতে নির্বাচনের কারণে কড়াকড়ি আরোপ করা ছিল। এ কারণে আগতদের বেশিরভাগই মাদক না পেয়ে ফিরে আসেন। স্থানীয় এক সোর্স প্রতিবেদককে নিয়ে গেলেন সীমান্তের নো ম্যানস ল্যান্ডে। একটি নির্দিষ্ট স্থানে দাঁড় করিয়ে রেখে সোর্স নিজেই গেলেন মাদক কিনতে। কিছুক্ষণ পর দেখা গেল বিজিবি সদস্যদের কাছ থেকে ফিরে আসছেন সোর্স। হাতে ফেনসিডিলের বোতল। কিন্তু পরবর্তী সময় বিজিবির আক্রোশে পড়ার ভয়ে নিজের নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করলেন সোর্স।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ১০ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লে. কর্নেল গোলাম সারোয়ার আমাদের সময়কে বলেন, ইতোমধ্যে সীমান্তের ওই পয়েন্টের (তালতলা) এক বিজিবি সদস্য এ ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ার তথ্য আমরা পেয়েছি। তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। এ বিষয়ে জিরো টলারেন্স দেখায় বিজিবি। সুতরাং কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই।

কুমিল্লা শহরের চকবাজারের বাসিন্দা আফজাল হোসেন (ছদ্মনাম)। রবিবার রাতে চকবাজার এলাকা থেকে আফজালকে আটক করে পুলিশ। রাতেই তার পরিবারকে ফোন করে টাকা নিয়ে যেতে বলেন। চাঁদার টাকা না পেলে মাদক মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখানো হয় তার পরিবারকে। আফজালের ওপর শারীরিক নির্যাতনও চালায় পুলিশ। সোমবার সকালে কোতোয়ালি থানার সামনে বসে থাকতে দেখা যায় আফজালের স্ত্রীকে। সঙ্গে দুটি ছোট্ট শিশু। হতদরিদ্র এ পরিবারটির কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা নিয়ে দুপুরের দিকে তাকে ছেড়ে দেয় পুলিশ। দিনমজুর আফজাল পুলিশের আক্রোশ থেকে বাঁচতে নিজের নাম-পরিচয় গোপন রাখতে অনুরোধ জানান।

আফজাল হোসেন পুলিশের কাছ থেকে মুক্তি পেয়ে আমাদের সময়কে বলেন, কোনো অপরাধ নেই আমার। পুলিশ ধরে নিয়ে পিটাতে পিটাতে বলল ‘তুই মাদক ব্যবসা করস।’ আফজালের ব্যাপারে খোঁজ নিতে চকবাজার এলাকায় তার বাড়িতে যান এই প্রতিবেদক। প্রতিবেশীরা জানান, খুবই নিরীহ প্রকৃতির মানুষ আফজাল। মাদক সেবন বা কেনাবেচা কোনোটিতেই তার জড়িত থাকার কথা না। মাঝেমধ্যে তিনবেলা খাবারও জোটে না পরিবারটির। তখন তাদের ভরসা প্রতিবেশীদের দেওয়া সামান্য চাল-ডাল। সেই পরিবারটির কাছ থেকে এতগুলো টাকা পুলিশ জোর করে নেওয়ার কথা শুনে প্রতিবেশীরা পুলিশের কড়া সমালোচনা করেন।
কুমিল্লা শহরে মাদক মামলায় ফাঁসানের ভয় দেখিয়ে এমন চাঁদাবাজি নতুন কিছু নয়। স্থানীয়রা বলছে, এটি পুলিশের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তার নিত্য কর্মকা-।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় কুমিল্লা মাদকের অন্যতম প্রবেশদ্বার। সীমান্ত এলাকাসহ মাদক কারবারে জড়িয়ে পড়েছেন অনেকেই। কিন্তু বিজিবি ও পুলিশকে ‘ম্যানেজ’ করেই বেশিরভাগ মাদক পৌঁছে যাচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। এলাকার অনেক সাধারণ মানুষকেই তুলে নিয়ে টাকা না দিলে নির্যাতন চালানো হয়। কাক্সিক্ষত চাঁদা না পেলে ‘মাদক মামলায় ফাঁসানো’র ভয় দেখানো হয়। নিরীহ লোকজন ধরে এনে চাঁদাবাজি এবং মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দেনদরবারের জন্য গড়ে উঠেছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হলেন মো. হোসেন, সোহাগ, রতন মিয়া ও সজল। প্রতিবেদনের শুরুতেই যে মাদক ব্যবসায়ীর কথোপকথন উল্লেখ করা হয়েছে তার নাম মো. সেলিম। পুলিশকে ম্যানেজ করে দাপটের সঙ্গে প্রকাশ্যেই ঘুরে বেড়ান তিনি।

মাসখানেক আগে কুমিল্লা সদর থেকে অপহরণের শিকার হন এক ব্যক্তি। তার এক স্বজন জানান, অপহরণের পর চাঁদা দাবি করা হয় একটি মোবাইল নম্বর থেকে। নম্বরটি সরবরাহ করা হলে সেটির সূত্র ধরে পুলিশ অনুসন্ধান শুরু করে। একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, থানার এক এসআইয়ের নেতৃত্বে তাকে অপহরণ করে চাঁদা দাবি করা হয়। বলা হয়, তিনি মাদক ব্যবসায় জড়িত। ইতোমধ্যে ওই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তির প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে বলে জানিয়েছে জেলা পুলিশের একটি সূত্র।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, কুমিল্লা শহরে বিশেষ করে সীমান্ত এলাকার দিকে যাতায়াত করা লোকজনকে তল্লাশির নামে পকেটে মাদক দিয়ে ফাঁসানোর চিত্র নিত্যদিনের। অনেক নিরীহ মানুষই এমন ঘটনার শিকার হচ্ছেন। ঠিক এ কারণে সীমান্ত এলাকায় থাকা আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যেতেও ভয় পান কেউ কেউ।

এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে কুমিল্লার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. শাহ আবিদ হোসেন আমাদের সময়কে বলেন, যে কোনো অনিয়ম-দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়ে থাকে। পুলিশ সদস্য হলেও কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। উৎস: দৈনিক আমাদের সময়।

ad

পাঠকের মতামত