201065

একসময় তৈরি হতো টাকা! আর এখন …

প্রাচীন বাংলার রাজধানী ঐতিহাসিক সোনারগাঁ একসময় বিত্তবৈভব আর জৌলুসে জাঁকজমকপূর্ণ নগরী হিসেবে বিশ্ববাসীর কাছে ছিল সমাদৃত। ব্যবসা-বাণিজ্য, অর্থনীতি ও রাজনৈতিক দিক দিয়ে স্বয়ংসম্পূর্ণ এ নগরীতে ছিল বেশ কয়েকটি মুদ্রার প্রচলন। আর এসব মুদ্রা তৈরি করা হতো তৎকালীন রাজধানী সোনারগাঁয়ের নিজস্ব টাঁকশালেই। সোনারগাঁয়ে দুটি টাঁকশালের খোঁজ পাওয়া যায়। এর মধ্যে একটি সোনারগাঁয়ের জামপুর ইউনিয়নের মহজমপুর এলাকায়। সুলতানি আমলের ওই টাঁকশাল আজ নিশ্চিহ্ন। আরেকটির অবস্থান পানাম নগরের কাছে আমিনপুর এলাকায়। বর্তমানে এর অবস্থাও বিলীন হওয়ার পথে।

জানা যায়, সুলতানি আমলের একমাত্র টাঁকশালটি ছিল মহজমপুরে। ইলিয়াছ শাহী বংশের শাসনামলে অনেক মুদ্রা সোনারগাঁয়ের এ টাঁকশালে মুদ্রিত হতো। সোনারগাঁয়ে ইলিয়াছ শাহী বংশের শাসনামল শুরু হয় ১৩৫৩ খ্রিস্টাব্দে। শামসুদ্দিন ইলিয়াছ শাহ ছিলেন এ বংশের প্রথম শাসক। ইলিয়াছ শাহী আমলের অন্যতম শাসক ছিলেন সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। তাঁর আমলেই সোনারগাঁয়ে স্বাধীনভাবে নিজস্ব মুদ্রার প্রচলন ঘটে। স্থানীয় লোকেরা আমিনপুরের টাঁকশালটিকে ক্রোড়িবাড়ী বলে থাকে। মোগল সম্রাট আকবরের সময় পরগনার রাজস্ব অধিকর্তা ও রাজস্ব সংগ্রাহকের পদবি ছিল ক্রোড়ি। তিনি আর্থিক কাজের জন্য ১৫৭৪ খ্রিস্টাব্দে ১৮২ জন ক্রোড়ি নিয়োগ করেছিলেন। ধারণা করা হয়, সে থেকেই এ বাড়ির নাম ক্রোড়িবাড়ি। সোনারগাঁয়ের ঐতিহাসিক পানাম নগরের কাছে অপূর্ব স্থাপত্যশৈলীর এক অন্যতম নিদর্শন হচ্ছে ক্রোড়িবাড়ি টাঁকশাল। প্রায় চার শতাব্দীর পুরনো এ টাঁকশালটি এখন পরিত্যক্ত একটি ভবন। গৌরীয় দোচালা স্থাপত্য রীতিতে তৈরি এ টাঁকশালটির চারদিকে রয়েছে পাতলা জাফরি ইটের উঁচু দেয়াল, যা দেখলেই অনুমান করা যায় এ স্থানটি তৎকালে সংরক্ষিত এলাকা ছিল। টাঁকশালটির উত্তরে রয়েছে বিশাল দিঘি। একসময় দিঘিটির চারদিকে প্রকাণ্ড আকারে শান বাঁধানো ঘাট ছিল। বর্তমানে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। তবে দিঘিটি আগের মতোই রয়েছে। এ টাঁকশালটির স্থাপত্যকলা বেশ বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। মুসলিম এবং হিন্দু স্থাপত্যের অপূর্ব সংমিশ্রণে এ টাঁকশালটি তৈরি করা হয়েছে। টাঁকশালের দেয়ালে রয়েছে লতাপাতাসহ নানা ধরনের অলঙ্করণ। রয়েছে ঢেউ খেলানো খিলান। খিলানের মাথায় রয়েছে বাজপাখি ও পদ্ধপাখির খোদাই করা প্রতিকৃতি। ভগ্নপ্রায় ইমারতে রয়েছে অসংখ্য খুপরি ও কুঠরি। ভূগর্ভস্থ কুঠরিগুলোতে সরকারি মুদ্রা ও সোনার মোহর রাখা হতো। ঐতিহাসিকদের মতে, সম্রাট আকবর ও শেরশাহের আমলে এ ভবনটি ছিল ট্রেজারার হাউস। সম্রাট শেরশাহের আমলে এ অঞ্চলে ব্যাপকভাবে অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটেছিল। শেরশাহের আমলে প্রচলিত মুদ্রাগুলো ক্রোড়িবাড়ি টাঁকশালে মুদ্রিত হতো বলে জানা যায়।

ঐতিহাসিক স্বরূপ চন্দ্র রায় সুবর্ণ গ্রামের ইতিহাসগ্রন্থে উল্লেখ করেছেন, শামসুদ্দিন আবুল মুজাফফর শাহের নামাঙ্কিত মুদ্রা সোনারগাঁয়ে মুদ্রিত হয়েছিল। তা ছাড়া ঐতিহাসিক ব্রাডলি বার্ট তাঁর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘রোমান্স অব অ্যান ইস্টার্ন ক্যাপিটালে’ ক্রোড়িবাড়ির নাম উল্লেখ করেছেন। দুটি টাঁকশালের মধ্যে একটি বিলীন হয়ে গেলেও জরাজীর্ণভাবে দাঁড়িয়ে আছে ক্রোড়িবাড়ি টাঁকশালটি। অযত্ন-অবহেলায় জরাজীর্ণ হয়ে আছে এ টাঁকশাল। এটি সংস্কারে সরকারিভাবে নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ। অথচ সোনারগাঁয়ের ইতিহাসের সঙ্গে এই টাঁকশালটিও জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে।

এলাকাবাসী জানায়, টাঁকশালের অধীনে প্রায় ৫০ বিঘা জমি রয়েছে। সরকারের দেখভালের অভাবে জমিগুলো স্থানীয় প্রভাবশালীরা ধীরে ধীরে দখল করে নিচ্ছে। স্থানীয় অসীম দাসগুপ্ত ওরফে লিটন মিয়া নামের এক ব্যক্তি আমিনপুর গ্রামের বাসিন্দা সাব্বির হোসেন, জাকির হোসেন, হাসেম মিয়া ও জাহাঙ্গীর হোসেনের কাছে টাঁকশালের জমি ও পুকুর ভাড়া দিয়ে প্রতিবছর ভাড়া বাবদ টাকা আদায় করছেন।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে অসীম দাসগুপ্ত বলেন, ‘টাঁকশালের জায়গার জন্য আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি সরকার অধিগ্রহণ করেছিল। এই জায়গার মালিকানা নিয়ে সরকারের সঙ্গে আমাদের মামলা চলছে।’

সোনারগাঁ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) বি এম রুহুল আমিন জানান, প্রাচীন বাংলার ঐতিহ্য টাঁকশালটি সংস্কারের জন্য ইতিমধ্যেই মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। সংস্কারের মাধ্যমে টাঁকশালটি দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় করে তোলা হবে। অবৈধভাবে দখলের বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি জানান, অসীম দাসগুপ্ত নামের এক ব্যক্তি সরকারি জায়গা অবৈধভাবে দখল করে রেখেছেন। শিগগিরই অবৈধ দখলদারদের উচ্ছেদ করা হবে।

নারায়ণগঞ্জ-৩ (সোনারগাঁ) আসনের সংসদ সদস্য লিয়াকত হোসেন খোকা বলেন, ‘সোনারগাঁয়ের ঐতিহ্যবাহী পুরনো টাঁকশালটি সংস্কার করার জন্য মন্ত্রণালয়ে ডিও লেটার দেওয়া হয়েছে। অনুমতি পেলেই সংস্কারকাজ শুরু হবে।’

ad

পাঠকের মতামত