197064

আঁচ করলেও বাঁচলেন না লিজা

‘আমার বউকে চাকরিতে ঢোকার পর থেকেই তিনি (ক্লিনিকের মালিক) সবসময় উত্ত্যক্ত করতেন। তার সাথে সময় কাটাতে কুপ্রস্তাবও দিয়েছেন অনেকবার। আমি বলেছিলাম ওই হাসপাতালে আর চাকরি করার দরকার নাই। আমার বউ কইছিল, আর মাত্র ১৫ দিন চাকরিটা করি। বেতনটা নিয়েই চাকরিটা ছেড়ে দিব। কিন্তু এই ১৫ দিন আর আর শেষ হলো না। লিজাই একেবারে শেষ হয়ে গেল।’

এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর মধ্যবাড্ডা এলাকার হায়দার ডিজিটাল ডেন্টাল ক্লিনিকে নির্মমভাবে খুন হওয়া অভ্যর্থনাকর্মী লিজা আক্তারের স্বামী মো. আরাফাত রহমান ।

২ জানুয়ারি, শুক্রবার বিকেলে হায়দার ডিজিটাল ডেন্টাল ক্লিনিকের একটি কক্ষ থেকে লিজা আক্তারের রক্তাক্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। তিনি ওই ক্লিনিকের অভ্যর্থনাকর্মী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

আরাফাত রহমান আরো জানান, তিনি সিলভার গ্ররুপের বায়িং হাউসের মেসেঞ্জার পদে চাকরি করেন। ২ বছর আগে লিজার সাথে তার বিয়ে হয়। তাদের গ্রামের বাড়ি বরগুনা জেলার তালতলি থানার ছোট ভাইজোড়া গ্রামে। বিয়ের পর তিনি স্ত্রীকে নিয়ে মধ্যবাড্ডার ৬ নাম্বার সড়কের ১৯৩ বাসায় বসবাস করতেন। মাস তিনেক আগে তার স্ত্রী লিজা হায়দার ডিজিটাল ডেন্টাল ক্লিনিকে রিসিপশনিস্ট পদে চাকরি নেয়। চাকরির যোগদানের পর থেকে ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক নজরুল ইসলাম ওরফে জুলফিকার তাকে নানাভাবে খারাপ প্রস্তাব দিত বলে লিজা তার স্বামীকে জানিয়েছিলেন। কিন্তু এমন ব্যবহার সহ্য করতে না পেরে লিজা সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে চলতি মাস অফিস করবে। এরপর বেতন নিয়ে চাকরিটা ছেড়ে দেবে। এই কথা লিজা ক্লিনিকের মালিককেও জানিয়েছিল।

গতকালের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে আরাফাত বলেন, ‘গতকাল লিজার সাপ্তাহিক ছুটি ছিল। তাই সে বাসাতেই ছিল কিন্তু তার মালিক তাকে ফোন করে অফিসে ডেকে নেয়। এরপর বেলা ১১টার দিকে লিজার সাথে একবার ফোনে কথা হয়েছে। দুপুরে ক্লিনিক থেকে আমাকে ফোনে জানানো হয় যে আমার স্ত্রীর লাশ পাওয়া গেছে। আমি গিয়ে দেখি রক্তাক্ত ও উলঙ্গ অবস্থায় তার লাশ পড়ে আছে। তার শরীরে ছুরি দিয়ে আঘাতের অনেক চিহ্ন রয়েছে। ও দেড় মাসের গর্ভবতী ছিল’, বলেই হু হু করে কেঁদে ফেলেন আরাফাত।

আরাফাতের দাবি, ওই ক্লিনিকের মালিক নজরুল ইসলাম ওরফে জুলফিকার লিজাকে ধর্ষণের চেষ্টা করেছিল। সে বাধা দেওয়াতে তাকে এমন নির্মমভাবে খুন করা হয়েছে। আর এই কাজে তাকে হয়তো আরও অনেকে সাহায্য করেছে । হাসপাতালে ৮টি সিসি ক্যামেরা লাগানো ছিল। কিন্তু গতকাল সব ক্যামেরা বন্ধ রাখা হয়েছিল। তাকে পূর্বপরিকল্পনা করেই খুন করা হয়েছে।

নিহতের মামা সজল তালুকদার প্রিয়.কমকে বলেন, ‘আমার ভাগ্নি দেখতে সুন্দর ছিল। তাকে ধর্ষণ করতে না পেরে এভাবে খুন করেছে। আমরা এর বিচার চাই । ওই ক্লিনিকের মালিকের যেন শাস্তি হয়।’

তিনি আরও জানান, লাশের ময়নাতদন্ত শেষ করা হয়েছে। এখন লাশ দাফনের জন্য তারা গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন ।

লিজার লাশের সুরতহাল রিপোর্ট থেকে জানা যায়, হায়দার ডিজিটাল ডেন্টাল ক্লিনিকের ভিতরের দক্ষিণ পাশের একটি কক্ষে লিজার লাশটি পড়ে ছিল। ডান কানে একটি জখমের চিহ্ন ছিল। আর ডান হাতের কবজি একটি রক্তাক্ত কাপড় দিয়ে হালকাভাবে বাঁধা ছিল। শরীরের উপরের অংশ বিবস্ত্র অবস্থায় ছিল। পিঠের ডান পাশে ৫টি, পিঠের মাঝ বরাবর আরও ২টি ফুটাসহ শরীরে বেশ কয়েকটি স্থানে আঘাতের চিহ্ন রয়েছে।

এই বিষয়ে বাড্ডা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী ওয়াজেদ আলী প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এই ঘটনায় একটি হত্যা মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে।’

লিজার স্বামীর দাবি হত্যাকাণ্ডের সাথে ক্লিনিকের মালিক জড়িত, তাহলে মামলায় তার নাম নেই কেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, ‘তারা সন্দেহ করে মালিকের নাম বলছে। মালিক যে মারছে এটা তো আর কেউ দেখে নাই। কেউ যদি না দেখে তবে তো সন্দেহ করে নাম দিতে পারবে না। সে জড়িত থাকতে পারে।’

গতকালের ঘটনার সময়কার সিসি টিভি ফুটেজ সম্পর্কে জানতে চাইলে ওসি বলেন, ‘সবকিছুরই তদন্ত করা হচ্ছে।’

সূত্র: প্রিয়

ad

পাঠকের মতামত