ক্রিকেট বিশ্বের রোমান্টিক কাপলদের প্রেমকাহিনী
মাঠে গন্ডি পেরিয়ে ক্রিকেটারদেরও যে একটি পার্সোনাল লাইফ আছে সেটা হয়তো অনেকেই ভুলে যায়। আর অনেক্সময় তাদের সেই প্রেম কাহিনী সিনেমার কাহিনীকেও হার মানায়।
সাকিব আল হাসান এবং শিশিরঃ গল্প মোটামুটি সবার জানা। তবুও তা দিয়েই শুরু করি।
দিবা-রাত্রির ম্যাচে ‘শিশির’ সিক্ত শ্বেত বলটা বড় বেশী ঝামেলার কারণ হয়। কিন্তু ‘শিশির’ যখন কোনো মানবী তখনও কি সাকিবের সমস্যা হয়?
এখন না হলেও শুরুর দিকে হয়তো হয়েছিল। সাকিব যে কোনোমতেই মানবী ‘শিশির’
কে মন থেকে তাড়াতে পারছিলেন না।
শিশির দেখতেন টিভিতে ছেলেটাকে খুব দেখায়। আমেরিকান প্রবাসী হলেও বাংলাদেশী টিভি চ্যানেল দেখতেন। সেখানে ওই একজনের চেহারাই দেখা যায় প্রায়ই। ইংলিশ সামারে গিয়ে দেখেন কাউন্টি ক্রিকেটেও সেই ছেলেটিকেই দেখা যায়! ভারী আশ্চর্য্য হলেন শিশির। এই ছেলে সর্বত্র কি করে? তিনি নাকি ক্রিকেট খেলেন!
শিশির ক্রিকেট বোঝেন না, তবে বুঝলেন ক্রিকেটারটিকে। ব্যস! পরিচয় হতে সময় লাগেনি খুব একটা। পরিচয় থেকে পরিণয়েও বেশী সময় নেননি। ১২/১২/১২ দিন-মাস-বছরের এমন সুন্দরতম এক মিলন তিথিতে মিলিত হলো চার হাত।
মিচেল স্টার্ক এবং হিলিঃ২০১৪ এর টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপের সেমিফাইনালিস্টদের মনে আছে?
আয়োজক যে বাংলাদেশ ছিল, সেটা নিশ্চয় মনে রেখেছেন। সেবারের ফাইনালিস্ট যে ভারত-শ্রীলংকা ছিল তা কি মনে আছে? আচ্ছা, সেসব বহু পুরনো কথা। মনে না রাখলেও ক্ষতি নেই। সেই ’১৪ এর টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার দৌঁড় কদ্দুর ছিল মনে আছে কি? উইন্ডিজের স্যামির ব্যাটে যে ফকনারের অস্ট্রেলিয়ার শেষ হয়ে গিয়েছিল সুপার এইটেই, সে রোমাঞ্চও কি ভুলে গেলেন?
স্মৃতির কুঠুরীতে খুব জ্বালাতন হচ্ছে, না? ক্ষমা করবেন, পাঠক।
অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপ শেষ, পুরো অস্ট্রেলিয়া দলও ফিরে গেছে বাড়ি। কেবল রয়ে গেছেন মিচেল স্টার্ক! কেন? বাহ রে, এ্যালিসা হিলি যে অস্ট্রেলিয়ান উইমেন্স টিমে খেলেন! অজি-প্রমিলা ক্রিকেট দলের উইকেটের পেছনটা সামলান হিলি।
পরিচয় সেই ন’বছর বয়সে। তারপর দু’জনে যত বড় হয়েছেন, বেড়ে উঠেছে তাদের শৈশবে রোপণ করা প্রেমের সেই চারাগাছও। তাদের সম্পর্কটা পরিণয়ে রুপও নিয়েছে ২০১৬ এর ১৬ই এপ্রিল।
ক্রিকেটের সাথে তাদের যে রোমান্স, সেটা তাঁরা হয়তো আরো বিস্তৃত করে নিয়েছেন নিজেদের মধ্যে।
মঈন আলী এবং ফিরোজাঃ কৈশোর ছাড়িয়েছে মাত্র, ক্রিকেটের সাথে সম্পর্কটা গাঢ় হবে হবে করছে। সদ্য তারুণ্যে পা-রাখা ওই বয়সে খেলতে এসেছিলেন বাংলাদেশে। ক্রিকেটের সম্পর্কটা আরো ঘনীভূত হবে, জাতীয় দলে জায়গা পাওয়ার একটা উপায় করবেন, এই ছিল হয়তো সংকল্প। কিন্তু অদৃশ্যে থাকা নিয়তি যে তখন মুচকে হাসছেন তা বোঝার সাধ্য কি ‘সাধারণ’ মঈন আলীর!
বাংলাদেশের মেয়ে ফিরোজাকে দেখে পছন্দ হয়ে গেল মঈনের। ফিরোজা বাংলাদেশী হলেও, পরিবার ইংল্যান্ডেই বাস করেন। পাত্রের ব্যাপারে মেয়েপক্ষেরও কোনো দ্বিমত রইলো না।
ক্রিকেটের সঙ্গে সম্পর্ক গাঢ় করার আগে ফিরোজার সঙ্গেই সুন্দরতম এক সম্পর্কে জড়িয়ে গেলেন মঈন। হয়ে গেলেন বাংলাদেশের ‘জামাই’।
তামিম ইকবাল এবং আয়েশাঃ এই গল্পটা আমাদের চারপাশেরই কোনো গল্প।
ছেলেটা প্রথম দেখাতেই মেয়েটাকে পছন্দ করে ফেলেছিল। কিন্তু মেয়ের উত্তর ছিল-
“কী? প্রেম? আমি ‘প্রেম’ শব্দটাকেই ঘৃণা করি!”
বুঝুন অবস্থা! হুঁহ, ছেলেও নাছোড়বান্দা। ছাড়বেন কেন? লেগে রইলেন আঠার মতো। অবশেষে মেয়ের মন গললো কিছুটা। ‘প্রেম’ না হলেও বন্ধুত্বের প্রস্তাবটা গ্রহন করলেন সাদরে। সেই বন্ধুত্বটাকেই পাখির চোখ করে ছেলেটা তাঁর লক্ষ্যের দিকে ঠিকই এগিয়ে যেতে থাকেন। একটা সময় মেয়েটাও বুঝতে পারে, এই ছেলে তাঁর জন্য বন্ধুর চেয়েও বেশী কিছু হতে পারে। সেজন্য মালয়েশিয়ায় যখন পড়তে যাচ্ছিলেন, তখন ছেলেটাকে ছেড়ে মোটেই যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না মেয়েটার।
অপেক্ষার অবসান হয়। পড়াশোনা শেষ করে মেয়ে ফিরে ঘরে, ছেলেটাও ইতিমধ্যে পায়ের নীচে খুঁজে পায় নিজের শক্ত জমিন। সেই শক্ত জমিনে দাঁড়িয়ে মেয়ের বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠায় ছেলেটা। আর পাত্র যদি হন তামিম ইকবাল, তাঁকে হাতছাড়া করবেন কোন অভিভাবক? মেয়েপক্ষও তাই আর ‘না’ করেননি।
অবশেষে ২০১৩ সালের ২২শে জুন তামিম-আয়েশা আবদ্ধ হন পৃথিবীর সবচেয়ে শুদ্ধতম এক বন্ধনে।
৫
শেষ করবো চমৎকার একটি রোমান্টিক গল্প দিয়ে।
আইভো ব্লাইয়ের নাম শুনেছেন? না শুনলে দোষ দেয়ার নেই। কারণ ব্লাই সাকূল্যে ম্যাচ খেলেছেন চারটি। ১০ এর আশেপাশে গড়। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার বিস্তৃত ছিল মাস দুয়েকের মতো, খেলেছেন একটি সিরিজ।
কিন্তু ওই একটি সিরিজ দিয়েই অমরত্ব পেয়ে গেছেন ব্লাই। স্পফোর্থ-কান্ডে শোকস্তব্ধ ইংলিশ ক্রিকেট ফিরতি সিরিজ খেলতে গেল অস্ট্রেলিয়ায়। যে করেই হোক, লজ্জা ও অপমানের প্রতিশোধ নিতেই হবে। সে সিরিজে ইংলিশ ক্রিকেটের নেতৃত্বে ছিলেন ব্লাই। ইংল্যান্ড সিরিজ জিতল ২-১ এ, পুরো সিরিজে সর্বোচ্চ ১৯ করা ব্লাই তখন ইংলিশ ক্রিকেটের নায়ক বনে গেছেন।
মেলবোর্নে আনুষ্ঠানিকভাবে বেল পুড়িয়ে ‘ছাই’ স্মারক তুলে দেয়া হয় ইংল্যান্ডের হাতে। সেই স্মারক তুলে দেয়া অস্ট্রেলিয়ান নারী দলের মধ্যে ছিলেন ফ্লোরেন্স মরফি। মরফিকে দেখেই ভালো লেগে গেল ব্লাইয়ের। ব্লাই ‘ছাই’ হাতে তুলে নিলেও, মন দিয়ে দিলেন ওই মরফিকেই।
শুরু হলো নতুন এক গল্প। উচ্চ শিক্ষিত, উচ্চ বংশীয় ইংলিশ আইভো ব্লাইয়ের সঙ্গে নিম্ম মধ্যবিত্ত অস্ট্রেলিয়ান ফ্লোরেন্স মরফির সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েন শুরু হলো ব্লাইয়ের অভিজাত পরিবারে। কিন্তু প্রেম তাতে আটকালে তো!
ব্লাই ‘কুমার’ অবস্থায় অস্ট্রেলিয়ায় গেলেও ইংল্যান্ডে ফিরলেন স্ত্রী নিয়ে। একজন জীবন সঙ্গী নিয়ে। ফ্লোরেন্স মরফিকে নিয়ে। ক্রিকেট ক্যারিয়ার অংকুরে থেমে গেলেও মরফির সঙ্গে জীবন-ক্যারিয়ার ব্লাইয়ের মৃত্যুর আগ পর্যন্ত চলন্ত-ই ছিল।
শতবর্ষী এ্যাশেজ কেবল ধুন্ধুমার প্রতিদ্বন্ধিতারই নয়, প্রেমেরও। বিয়েরও। ভালোবাসারও।




