187744

পানি অমূল্য, বরং বিয়ার পান করুন!

পানির জন্য মিছিল আমরা অনেক দেখেছি। মারামারি কাঁটাকাঁটিও কম দেখিনি।

ওয়াসার লাইনে পানি নেই। অথবা নোংরা পানি। কিন্তু যদি বলা হয় পুরো পরিবার দিনে ৮০ লিটার পানি পাবেন (মানে ২০ লিটারের চার বালতি), এবং এটা দিয়েই আপনাকে দিনের পর দিন চলতে হবে? এই কোটাতে আপনাকে রান্না বান্না, গোছল, কাপড় ধোয়া, ঘর মোছা, চাই কি বাগানে পানি দেয়া বা গাড়ী ধোয়ামোছা, হ্যা, যাবতীয় কাজ সারতে হবে? আপনি কি করবেন তখন? কেপটাউনে বেশ কবার এসেছি শিপে করে। বাইরে ঘুরে এসেছি। হোটেলে চোখে পড়ত পানির ব্যবহার যেন “হিসেব মত” মত করি। কিন্তু পানির এমন অপ্রতুলতা? এবার হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।

শিপে সাধারণত সমুদ্রের পানিকে সুপেয় পানি করার প্ল্যান্ট থাকে। সমুদ্রে চলমান থাকা কালে প্রতিদিন গড়ে ১২ থেকে ১৫ টন (১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার লিটার) পানি উৎপাদন করে থাকি। আর প্রতিদিন খরচ ৫/৬ টন (শিপ থেকে শিপে আলাদা হবে, এই শিপে টয়লেট ফ্লাশিং ভ্যাকুমে, এরোপ্লেনে যেমন থাকে)।

অর্থাৎ প্রতিদিন আমাদের বাড়তি পানি থাকে প্রায় ১০ টনের মত, যা দিয়ে শিপের আনাচে কানাচে প্রায় প্রতিদিন ধুয়ে মুছে রাখি। ফ্রেশ ওয়াটার প্ল্যান্ট শুধু মাত্র শিপ চলমান অবস্থায় কাজ করে, যখন পোর্টে বা এঙ্করে থাকি, তখন তা চলে না। এবার প্রায় মাস খানেক হল দক্ষিণ আফ্রিকার দুটো পোর্টে, কেপটাউন থেকে গেলাম পোর্ট এলিজাবেথে, ফের আবার এসেছি কেপটাউনে। বাধ্য হয়ে পোর্ট এলিজাবেথ থেকে ৫০ টন পানি কিনে নিতে হয়েছিল। পুনরায় যখন কেপটাউনে আসি, আমাদের রিজার্ভ পানির ভান্ডার কমে এসেছে। এজেন্টকে অনুরোধ করলাম ৫০ টন পানি সরবরাহ করতে। আর ধাক্কাটা খেলাম তখন!
স্থানীয় সরকারের (মেয়রের) বরাতে লেখা চিঠি পেলাম। পানির ক্রাইসিস চলছে। কোনক্রমেই পানি সরবরাহ করা হবে না! পানির মূল্য যে কত, টের পাচ্ছি হাড়ে হাড়ে!

তেমন বৃষ্টি নেই গত প্রায় তিন বছর। ১৩৬ বছরের মাঝে সর্বনিম্ন বৃষ্টি হয়েছে এই বছর। পানির সংগ্রহশালা বা ড্যামের অবস্থা বেশ করুন। বৈজ্ঞানিক ড্যাটা বলছে আগামী বছর মার্চের ১৫/১৬ তারিখে (এখানে একে গালভরা নামে ডাকা হয় “ডে জিরো”) পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যেতে পারে যদি অবস্থার উন্নতি না হয়। সবাইকে কঠিন রেশনিং এর মধ্য দিয়ে যেতে হবে। যেমনটা প্রথমে বলেছি, দৈনিক ৮০ লিটার প্রতি ফ্যামিলি। আপাতত সাবধান বাণী প্রচার চলছে। অনেকের সাথে কথা বলে জানলাম তারা ইতিমধ্যে রেশনিং শুরু করে দিয়েছে। মেয়র বলছে যে কোন দিন ঘোষণা আসবে। সিটি কর্পোরেশন তীক্ষ্ণ নজরদারীতে রেখেছে সবাইকে বেশ কিছুদিন হল। সেদিন খবরের কাগজে পড়লাম তিন পরিবারকে সাবধান করা হয়েছে, সাথে হেভি ফাইন। তারা নাকি দৈনিক আধা টন (পাঁচশ লিটার, বা ২৫টি ২০ লিটারের বালতি) করে ব্যবহার করেছে! স্কুলের সুইমিং পুল কার্যক্রম বন্ধ। হোটেল, রেষ্টুরেন্ট, পাব, অফিস, আদালত, সব জায়গায়ই নোটিশ আর নোটিশ।

কেন এমন হল?
গবেষণা বলছেঃ
১। শহরের জনসংখ্যা ঘনত্ব গত দশ বছরে প্রায় দিগুন হয়েছে। (বলে রাখি, কেপটাউন বাংলাদেশী আর পাকিস্তানিদের প্রিয় শহর)। ১৯৯৫ সনের চব্বিশ লাখ থেকে ২০১৮ তে এসে ৪৩ লাখে ঠেকেছে।
২। গত ১৩৬ বছরের মাঝে সর্বনিম্ন বৃষ্টির রেকর্ড। আমরা যত বেশী কার্বন নির্গত করব ততই আবহাওয়া গরম হয়ে উঠবে। যাকে বলা হয় গ্রিন হাউজ ইফেক্ট। কল কারখানা, গাড়ি এমনকি আমাদের বাড়ির এসি বা ফ্রিজ থেকেও যে গ্যাস নির্গত হয়, তা আকাশে উঠে ইথার লেয়ারের গায়ে ছিদ্র করে দিচ্ছে। আর তাতে সার্বিক তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে। আবহাওয়া প্রধাণ উপাদান তাপ। তাপমাত্রার পরিবর্তনের ফলেই ঝড়-বৃষ্টি-তুষারপাত-টর্নেডো ইত্যাদি হয়। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বেশ গোলমেলে হয়ে গিয়েছে। কখনকার বৃষ্টি যে কখন নামবে, বা কখনকার বন্যা যে কখন হবে কোন ঠিক ঠিকানা নেই।
৩। ভূমির উপরের ও নিচের পানির পরিকল্পনাহীন ব্যবহার। বর্তমানে ৬১১ মিলিয়ন লিটার থেকে বেড়ে ৬২৮ মিলিয়ন লিটারে উঠে আসা।
৪। নতুন পানির সোর্স যুক্ত না হওয়া, বা যেটুকু হয়েছে তা জনসংখ্যা বৃদ্ধির অনুপাতে অপ্রতুল। আশার কথা, খুব শিগ্রি নতুন ৭ প্রোজেক্টের মাধ্যমে পানির সরবরাহ বাড়ানো হবে। তার মাঝে মধ্য প্রাচ্যের সমুদ্র পানিকে সুপেয় পানিতে পরিণত করার পদ্ধতিও থাকবে। (তবে দূর্নীতি সর্বগ্রাসী, এই ডিসেম্বরেই নতুন প্রজেক্ট চালু হবার কথা, অথচ মাল মসলাই এখনো আসেনি। )

এখানে পাঁচটি ড্যাম (কাপ্তাই লেকের মত) বানানো হয়েছে পানি ধারণ ও সরবরাহ করার জন্য। দুটি ড্যামের পানির উচ্চতা ইতিমধ্যে সরবরাহ উচ্চতার থেকে নিচে নেমে গিয়েছে (১০% এ নেমে আসলে সরবরাহ বন্ধ করে দেয়া হয়), বাকী গুলোর সম্মিলিত সরবরাহ পদ্ধতি বন্ধ হয়ে যেতে পারে যদি না নতুন ভাবে বৃষ্টি হয় বা অন্য কোন ভাবে পানি তৈরী ও সরবরাহ না করা হয়। সেই বন্ধ হবার দিনটিকে বলা হচ্ছে Day Zero। মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি এসে পড়বে, এই গ্রীষ্ম কালে গত একমাসে একদিনও বৃষ্টি দেখিনি যে!

কঠিন রেশনিং চালু হয়ে গিয়েছে অনেক স্থানেই। টাবে গোছল সাড়তে বলা হচ্ছে, প্রথমে বাচ্চা, তারপরে একই পানি দিয়ে পুরুষ এবং সেই পানি দিয়েই মহিলারা সব শেষে করবেন! বেশিরভাগ জনগণ সপ্তাহে এক বা দুদিন গোছল করছে তাই! বাথরুমের ফ্ল্যাশিং হচ্ছে বালতি দিয়ে। গাড়ি ধোয়া একদম নিষিদ্ধ।

সেদিন এক হোটেলে খেতে গিয়েছি। আমার দেখা অন্যসব সাবধান বাণী থেকে এটাই ছিল সেরাঃ

Water is precious, rather drink beer!
“পানি অমূল্য, বরং বিয়ার পান করুন!”
লেখকের ফেসবুক থেকে
সূত্র: কালের কন্ঠ

ad

পাঠকের মতামত