বিনিশাকে কোথায় রাখা হয়েছিলো পরীক্ষা চলাকালীন ১৫ মিনিট?
পরীক্ষা চলাকালীন পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজের শিক্ষার্থী নেপালী নাগরিক বিনিশা শাহকে ডেকে পাঠায় কলেজ কর্তৃপক্ষ। সেখানে তাকে প্রায় ১৫ মিনিট সময় ব্যয় করতে হয়। এরপর পুনরায় পরীক্ষা কেন্দ্রে ফিরে এলেও তিনি আর পরীক্ষা দেননি। প্রায় ৩০ মিনিট সময় থাকতেই তিনি খাতা জমা দিয়ে বেরিয়ে যান। এরপরই হোস্টেলের রুমে গিয়ে আত্মহত্যা করেন। বিনিশার সহপাঠিদের প্রশ্ন পরীক্ষা চলাকালীন কেন তাকে ডেকে নেয়া হলো। এই ১৫ মিনিট তাকে কোথায় রাখা হয়েছিলো। ওই ১৫ মিনিটে তার সাথে কি ধরনের আচারণ করা হয়েছিলো যার কারণে বিনিশা আত্মহত্যার পথ বেছে নিতে বাধ্য হলো। সহপাঠী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, বিনিশার মৃত্যু একটি রহস্যজনক ঘটনা। তাদের দাবি, প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষের অনৈতিক টাকা দাবি, জরিমানার ফাঁদ ও অতিরিক্ত চাপে আত্মহত্যা করেছেন বিনিশা। আত্মহত্যার কারণ ও ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তারা।
এই নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাজধানীর ভাটারাস্থ বেসরকারি পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজের প্রধান ফটকের সামনে আন্দোলন করে কলেজটির সাধারণ শিক্ষার্থীরা। এসময় তারা কলেজ কর্তৃপক্ষের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদে ১০ দফা দাবি উত্থাপন করেন। আন্দোলনরতদের হাতে নানা ধরনের বক্তব্য সংবলিত প্লেকার্ড দেখা যায়। যাতে লেখা রয়েছে, ‘পরীক্ষা চলাকালীন বিনিশাকে কার কক্ষে ডেকে নেয়া হয়েছিলো, প্রায় ১৫ মিনিট কেন বিনিশা পরীক্ষা হলের বাইরে ছিল? তার সাথে কি আচারণ করা হয়েছিলো, কেন শিক্ষার্থীদের ফেলের ফাঁদে ফেলে অনৈতিকভাবে জরিমানা আদায় করা হয়? কথায় কথায় জরিমানা কেন এবং ফাইনাল প্রুফের পর অতিরিক্ত ছয় মাসের বেতন কেন দিতে হবে’।
জানা গেছে, বিনিশার কাছে কলেজ কর্তৃপক্ষের টাকা পাওনা ছিলো। যার কারনে টার্ম-২ পরীক্ষার প্রবেশপত্র আটকে রাখা হয়। পরে কিছু টাকা দিয়ে প্রবেশপত্র পেলেও ঘটনার দিন পরীক্ষা চালাকালীন তাকে হল থেকে ডেকে নেয়া হয়।
সোহান নামে এক শিক্ষার্থী জানান, কলেজ কর্তৃপক্ষ তাদের উপর অমানবিক চাপ প্রয়োগ করে আসছে। প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছ থেকে অনৈতিকভাবে একের পর এক জরিমানা আদায় করে যাচ্ছে। জরিমানা ছাড়া তারা কোনো শব্দ জানে না।
তারা বলেন, জরিমানার সব থেকে বড় ফাঁদ ফেল করানো। পাঁচ বছরের কোর্স সাত বছরেও শেষ হচ্ছে না এখানকার শিক্ষার্থীদের।
সোহান বলেন, সাত বছর পার হলেও তার পাঁচ বছরের কোর্স শেষ হচ্ছে না। বর্তমানে তিনি থার্ড ইয়ারে। মৌখিক পরীক্ষায় একবার পাশ করলে লিখিত পরীক্ষায় ফেল করিয়ে দেয়া হয়। আবার লিখিত পরীক্ষায় পাশ করলে মৌখিক পরীক্ষায় ফেল। আর প্রতিবার ফেল মানেই ৪০ থেকে ৭০ হাজার টাকা জরিমানা। এরপর আবার নতুন একটি বছরের সব ধরনের চার্জ তো রয়েছেই। এসব নিয়ে কথা বললেই ফেল করার হুমকি, চাপ আসে। এমনই কোনো চাপে বিনিশার আত্মহত্যা বলে দাবি করেন তিনি।
অপর এক শিক্ষার্থী বলেন, শুধু পরীক্ষা নয়, কলেজটি বাথরুম ব্যবহারেও জরিমানা আদায় করে থাকে। ওই শিক্ষার্থী বলেন, হোস্টেলের বাথরুমে বেশি পানি ব্যবহার, বা অপরিচ্ছন্ন করে রাখলে তাতেও জরিমানা গুনতে হয়। হোস্টেল রুমের ফ্যান বেশি সময় চালালে সেখানেও জরিমানা গুনতে হয় শিক্ষার্থীদের। এক কথায় জরিমানা ছাড়া কর্তৃপক্ষ কিছুই বোঝে না।
বিনিশার এক সহপাঠী বলেন, কলেজ কর্তৃপক্ষ কাউকে ডাকলে সব সময় একা একা যেতে হয়। কাউকে সাথে নিয়ে যাওয়া যাবে না। তখন এমনিতেই ভয় লাগে। এরপর তারা বিভিন্ন ধরনের প্রেসার দিয়ে কথা বলা শুরু করলে সেটা আরো ভয়ঙ্কর হয়ে ওঠে।
শিক্ষার্থীরা তাদের ১০ দফা দাবিতে বলেন, ১৫ মিনিটে কী হয়েছিল যার জন্য বিনিশাকে মরতে হলো। কোনো নোটিশ ছাড়া পরীক্ষা ক্লাস বন্ধ কেন। ফাইনাল প্রুফে সাপ্লি খেলে ছয় মাসের অতিরিক্ত বেতন কেন। ইন্টার্নের টাকা ভর্তি সময় নেয়ার পরও প্রতিবছর অতিরিক্ত ২৫ হাজার করে টাকা নেয়া হয় কেন। সেশন ফি নেয়ার পরও প্রতিবছর ৩০ হাজার করে টাকা কেন নেয়া হচ্ছে। টাকা নিয়ে পাস করানো বন্ধ করতে হবে। কথায় কথায় জরিমানা বন্ধ করতে হবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্ধারিত ফি নিতে হবে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী ইন্টার্নদের বেতন দিতে হবে। ইন্টার্ন চিকিৎসকদের সংগঠন গঠনের অনুমতি দিতে হবে।
তবে এ ব্যপারে আজ কলেজ কর্তৃপক্ষের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে আজও বিনিশার লাশ ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল মর্গের হিমঘরে রাখা ছিলো। তার লাশের ব্যাপারে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে পুলিশ।
উল্লেখ্য, রাজধানীর ভাটারা থানাধীন পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজের শিক্ষার্থী নেপালি নাগরিক বিনিশা শাহ গত মঙ্গলবার পরীক্ষা দিচ্ছিলেন। পরীক্ষার সময় শেষ হওয়ার আগেই তিনি পরীক্ষা হল থেকে বেরিয়ে যান। এরপর তার রুমমেট অন্য এক নেপালি শিক্ষার্থী পরীক্ষা শেষ করে বেলা সোয়া একটার দিকে রুমে গিয়ে দেখেন ভেতর থেকে দরজা বন্ধ। অনেক ডাকাডাকি করেও বিনিশার সাড়া না পেয়ে হোস্টেলে থাকা বিকল্প চাবি দিয়ে দরজা খুলে দেখেন বিনিশা সিলিং ফ্যানের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেছে। দুপুর পৌনে ২টার দিকে ভাটারা থানা পুলিশ পাইওনিয়ার ডেন্টাল কলেজের হোস্টেল রুম থেকে বিনিশার ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করা হয়। উৎস: নয়াদিগন্ত।




