181220

বন্ধুকে খুন করে মেঝেতে পুতে তার উপর তাহাজ্জুদের নামাজ আদায়

রাতের খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়েন পাবনা জেলার সুজানগর উপজেলার উলট গ্রামের রবিউল। বৃদ্ধ বাবা সকালে ঘুম থেকে উঠে খুঁজতে থাকে রবিউলকে। কিন্তু, ঘরে তাকে খুঁজে পায় না। ভাবে কোথাও বেড়াতে গেছে বুঝি।

পরদিনও ঘরে ফেরে না রবিউল। হঠাৎ রবিউলের ভাইয়ের ফোনে একটা এসএমএস আসে। ‘ভাইকে বাঁচাতে চাইলে ৫০ লাখ টাকা পাঠাও’। এবার যেন সবাই নড়েচড়ে বসে।

রবিউলের বাপ-ভাই কি করবে তা বুঝতে না পেরে রবিউলের সবচেয়ে কাছের বন্ধু মামুনের কাছে যায়। সেও তাদের সাথে তার বন্ধুকে খুঁজতে থাকে। মাঝখানে আরো একটা দিন কেটে যায়। কোনো উপায় না দেখে সুজানগর থানায় পরের দিন অর্থাৎ, ২২ সেপ্টেম্বর জিডি (নং-৯৩৬) করে রবিউলের বড় ভাই।

জিডির তদন্তের দায়িত্ব পড়ে এসআই বেলালের উপর। বিভিন্ন সূত্র ধরে তিনি এগোতে থাকেন। এক পর্যায়ে বাদীপক্ষ অধৈর্য হয়ে যান। হৃদয় নামের এক জনকে আসামি করে অপহরণ মামলা (নং-১১, তাং- ৫/১০/১৭) করেন। এরপর পুলিশ হৃদয়কে গ্রেপ্তার করে।

হৃদয়ের স্বীকারোক্তি মোতাবেক গ্রেপ্তার হয় আরো পাঁচ জন। তারা টাকা চাওয়ার কথা স্বীকার করলেও রবিউলের কোনো হদিসই দিতে পারে না। তীরে এসেও তরী ডোবার মতো ঘটনা। সব যেন গোলমেলে লাগছিল। তাহলে রবিউল গেল কই।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও প্রশাসন) জনাব গৌতম কুমার বিশ্বাস ও সুজানগর সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার রবিউল ইসলামও কোমর বেঁধে নামলেন কাজে। সবাই মিলে সিদ্ধান্ত নেন আইটিতে দক্ষ কাউকে কাজে লাগাতে হবে।

দায়িত্ব দেয়া হয় ডিবির এসআই অসিতকে। অদম্য কৌতূহলি অসিত সব শুনে মনোযোগ দিলেন রবিউলের জীবনযাপনের ওপর। ঘটনা ঘাটাঘাটির এক পর্যায়ে জানতে পারলেন, রবিউলের সাথে সর্বশেষ যোগাযোগ হয়েছিল মামুনের।

ঘটনার ১০/১৫ দিন পরই ঢাকায় চলে গেছে চাকরির খোঁজে। নানা প্রলোভনে ডেকে আনা হল তাকে। কি নিষ্পাপ নুরানী চেহারা। শশ্রুমণ্ডিত মুখ। ২০/২২ বছরের টকবগে যবক মামুন। কি হাসি-খুশি ছেলেটা। কোরআন হাদিসের জ্ঞান অগাধ। শুধু একটি বিষয় তার জানা ছিল না।

আর সেটা হলো পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ। রবিউল যেদিন হারায় সেই দিন তার মোবাইলের শেষ কলে সে মামুনকে কি বলেছিল, আর তাকে পাঠানো এসএমএসটা কি ছিল এই দুই প্রশ্নের জালেই ফেঁসে গেল মামুন। তাকে বলতেই হলো সেই ভয়ঙ্কর রাতের কথা।

প্রেমঘটিত কারণে রবিউলকে মামুন তার বাসায় ডেকে আনে। এরপর পূর্বপরিকল্পিতভাবে কৌশলে রবিউলকে কড়া ঘুমের ওষুধ মেশানো পানি খাওয়ায় সে। পরিকল্পনা মতো শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয় রবিউলকে। তারপর ঘরের মধ্যে একাই লাশের জানাজা পড়ে সে।

বন্ধুকে শোওয়ার চৌকির পাশে মেঝের মাটিতে কবর দেয়। তাহাজ্জতের নামাজও পড়ে খুনি। পরের দিন খুব স্বাভাবিকভাবে রবিউলের বাপ-ভাইদের সাথে মামুনকে খোঁজাখুঁজি করে মামুন। আবার ফাঁকে ফাঁকে পরিচয় গোপন করে মোবাইল ফোনে রবিউলের ভাইয়ের কাছে মুক্তিপণের টাকাও দাবি করে হত্যাকারী মামুন।

কিছু দিন পর চলে যায় ঢাকায়। কেউ ঘুনাক্ষরেরও জানতে পারে না কি হয়ে গেছে। কে জানতো কোন এক এসআই অসিত বা বেলালের মতো কোনো পুলিশ তার সবটুকু ঢেলে দিয়ে বের করে আনবে ঘটনার ভেতরের ঘটনা।

৫৬ দিন পর ১৭ নভেম্বর সকালে শত শত গ্রামবাসীর উপস্তিতিতে মাটি খুঁড়ে তারই দেখানো মতে বের করে আনা হয় হতভাগা রবিউলের লাশ। বেরিয়ে আসে হত্যার রহস্য।

পাবনার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার গৌতম কুমার বিশ্বাস বলেন, ঘটনাটি খুবই মর্মান্তিক। আর এ খুনের রহস্য বের করতে আমাদের অনেক পরিশ্রম হয়েছে। প্রযুক্তিগত সহায়তা আর পেশাদারিত্বের দ্বারা নিখুঁত তদন্তের মাধ্যমে আমরা এটি বের করতে সক্ষম হয়েছি।

তিনি আরো বলেন, আগের মামলাটিই এখন হত্যা মামলায় রুপান্তরিত হবে। মামলার আসামিই একজন। আদালতে মামুন ১৬৪ ধারায় জবানবন্দিতেও একই কথা বলেছে।

ad

পাঠকের মতামত