178090

ফিল্মি-স্টাইলে কয়েক ঘণ্টায় কোটিপতি সোহেল!

টেবিলের ওপরই থরে থরে টাকা বিছিয়ে রাখা দেখতে পান। এতে খুশিতে আত্মহারা হয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেন।দুর্ধর্ষ কাহিনী। যে কাহিনী হার মানিয়েছে কল্পকথার গোয়েন্দা সিরিজকেও। প্রতিদিনই একটু একটু করে খোঁড়া হতো সুড়ঙ্গ। মাটি ফেলা হতো পাশের একটি খালে।

সারা দিন সুড়ঙ্গ খোঁড়া শেষে রাতে আরেক বাসায় গিয়ে ঘুমাতেন হাবিব ওরফে সোহেল (৩৭)। দুই বছরের মাথায় সেই সুড়ঙ্গ পথ পৌঁছে যায় ব্যাংকের ভল্ট রুমে।

দেখে তো অবাক! টাকা একেবারে হাতের নাগালে। ফিল্মি-স্টাইলে নিয়ে যায় ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা। চালের বস্তার ট্রাকে সেই টাকা নেওয়া হয় ঢাকায়। ২০১৪ সালের জানুয়ারিতে কিশোরগঞ্জে ব্যাংক লুটের ঘটনা ঘটে এভাবেই।

সাড়াজাগানো এ ঘটনার নায়ক সোহেল ব্যাংক লুট করে হজম করার সব বন্দোবস্তই সেরে নিয়েছিলেন। কিন্তু শেষমেশ ধরা পড়তেই হয় তাকে। ট্রাকের হেলপারকে মহাখুশিতে টাকা দিয়েই সোহেল পড়েন ধরা। জানাজানি হয়। র‌্যাব আসে। পাকড়াও হন সোহেল। কয়েক ঘণ্টার কোটিপতি সোহেলের জায়গা হয় শ্রীঘরে। কারাগারে বন্দী জীবন কাটছে তার।

সাজা হয়েছে তার। সুড়ঙ্গ কেটে সোনালী ব্যাংকের ভল্ট থেকে ১৬ কোটি ৪০ লাখ টাকা লুটের ঘটনায় সোহেলকে পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড, ৫ হাজার টাকা জরিমানা, অনাদায়ে আরও পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে আদালত।

গ্রেফতারের পর টাকা লুটের অবিশ্বাস্য কাহিনী বর্ণনা করেছেন সোহেল। এত টাকা পেয়ে নিজেকে টাকার কুমির ভেবে বসেছিলেন। যে ট্রাকে করে ঢাকায় আসেন সেই ট্রাকের হেলপারকে দিয়ে দেন ৭ লাখ টাকা। দাতা হাতেম তাই সোহেলের শেষ রক্ষা হয়নি।

র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার দল শ্যামপুরের ভাড়া নেওয়া বাসায় হানা দিয়ে ধরে ফেলে সোহেলকে। এ সময় গ্রেফতার করা হয় ইদ্রিস নামে তার এক সহযোগীকেও। বাসার খাটের নিচে রাখা চারটি বস্তায় ভরা টাকাও উদ্ধার করা হয়। গ্রেফতারের পর দুর্ধর্ষ কাহিনী নিজেই খুলে বলেন সোহেল।

দুই বছর আগে করা হয় পরিকল্পনা:

ব্যাংক লুটের জন্য পরিকল্পনা করা হয় দুই বছর আগে। সে অনুযায়ী ব্যাংকের পাশের ওই বাড়িটি আড়াই হাজার টাকায় ভাড়া নেন সোহেল। দিনের বেলা তিনি এই বাড়িতে সুড়ঙ্গ খোঁড়ার কাজ করতেন।

রাতে গিয়ে পাশের নগুয়া এলাকায় স্ত্রীর সঙ্গে থাকতেন। সোহেল জানান, ব্যাংক লুটের পরিকল্পনা ছিল তার মামাশ্বশুর সিরাজের। তিনি আগে ঢাকায় শাহীন ক্যাবলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতেন।

যেভাবে খোঁড়া হয় সুড়ঙ্গ:

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে সোহেল বলেন, ২০১২ সালের প্রথম দিকে তিনি দুই কক্ষের ওই বাসাটি ভাড়া নেন। ভাড়া নেওয়ার কিছু দিন পরই কক্ষের পাশে সুড়ঙ্গ খোঁড়া শুরু করেন।

এর আগে হ্যামার, ছেনি, কোদালসহ প্রয়োজনীয় সব উপকরণ কেনেন। একই সঙ্গে বাড়িতে জড় করা হয় কাঠ ও বাঁশ। সোহেল জানান, প্রতিদিন একটু একটু করে সুড়ঙ্গ খুঁড়তেন। মাটি নিয়ে ফেলতেন বাসার ভিতরেই একটি খালে।

ভুল পথে গিয়েছিল সুড়ঙ্গ:

সোহেল জানান, বাড়ি থেকে ব্যাংকের ভল্টের মাপজোক নিয়ে খোঁড়ার পরও সুড়ঙ্গটি অন্যদিকে চলে যায়। মাসখানেক আগে সুড়ঙ্গের মাথা ওপরে বের করে দেখেন সেটা ব্যাংকের বারান্দা।

ওই বারান্দায় পুরনো চেয়ার-টেবিল রাখা ছিল। ফলে বিষয়টি কেউ টের পায়নি। পরে আবার মাপজোক নিয়ে নতুন পথে সুড়ঙ্গ খোঁড়া হয়। শুক্রবার সন্ধ্যায় সুড়ঙ্গ গিয়ে ঠেকে ব্যাংকের ভল্ট রুমে।

টেবিলেই পেয়ে যান টাকা:

সোহেল জানান, তার ধারণা ছিল ভল্ট রুমের আলমারি ভেঙে টাকা বের করতে হবে তাকে। কিন্তু ভল্ট রুমে ঢুকে টেবিলের ওপরই থরে থরে টাকা বিছিয়ে রাখা দেখতে পান। এতে খুশিতে আত্মহারা হয়েছিলেন বলে মন্তব্য করেন।

সোহেল জানান, সুড়ঙ্গ দিয়ে বৈদ্যুতিক লাইন নিয়ে ভিতরে লাইটও জ্বালিয়েছিলেন। ওই রুমের কোনো জানালা না থাকায় বাইরে থেকে সে আলো বোঝা যায়নি। রাত সাড়ে ৮টার দিকে ভল্ট রুম থেকে বাইরে বেরিয়ে আসেন। পরে সাত-আটটি প্লাস্টিকের বস্তা নিয়ে আবারও সুড়ঙ্গ পথে ভল্ট রুমে ঢোকেন।

টাকাগুলো বস্তায় ভরে নিয়ে আসেন নিজের বাসায়। রাত ২টার দিকে সব টাকা নিয়ে বাসায় ফেরত আসেন। পরে বাইরে থেকে আনা চটের বস্তায় ভরেন টাকাগুলো। ১ হাজার টাকার বান্ডিলগুলো দিয়ে তিনটি বস্তা ভরে ফেলেন। ৫০০ টাকার বান্ডিল হয় দুই বস্তা। টাকা আলাদা করতে করতেই তার সকাল হয়ে যায়।

চালের বস্তার ট্রাকে টাকা আনেন ঢাকায়:

সকালে তিন বস্তা টাকা নিয়ে একটি রিকশায় করে পাশের একটি চালের আড়তে যান। চালের আড়ত ছিল বন্ধ। রিকশা নিয়ে সকাল ৯টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন আড়তের সামনে। পরে ওই আড়ত থেকে ৫ লাখ টাকা দিয়ে ২০০ বস্তা চাল কেনেন।

১২ হাজার টাকায় ঢাকা পর্যন্ত ঠিক করেন একটি ট্রাক। শ্রমিকদের মাধ্যমে ওই চাল তোলেন ট্রাকে। এর আগে দুই ধাপে বাসা থেকে আনা টাকার বস্তাগুলো চালের বস্তার নিচে রাখেন। নিজের কাছে রাখেন ১৮-১৯ লাখ টাকা।

চাল ফরিদপুরে, টাকা খাটের নিচে:

সোহেল জানান, ঢাকায় আনার পর শ্যামপুরে লাল মসজিদের পাশে ট্রাকটি দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। এ সময় তিনি হন্যে হয়ে বাসা খুঁজতে থাকেন। আগে শাহীন ক্যাবলস নামে একটি প্রতিষ্ঠানে কাজের সুবাদে শ্যামপুরে থাকতেন সোহেল।

বালুর মাঠের পাশে তন্ময় ভিলায় সাড়ে ৮ হাজার টাকায় ষষ্ঠ তলায় একটি বাসা ভাড়া করেন। পরে আরেকটি কাভার্ড ভ্যান ভাড়া করে চালগুলো পাঠিয়ে দেন ফরিদপুরের এক উরসে। টাকার পাঁচটি বস্তা ও আট বস্তা চাল নিয়ে যান ওই বাসায়। ভ্যানচালক ও শ্রমিকদের দিয়ে চালগুলো ষষ্ঠ তলায় তোলেন।

যেভাবে গ্রেফতার হল সোহেল:

র‌্যাব কর্মকর্তারা জানান, ব্যাংক লুট হওয়ার পর থেকেই তারা গুরুত্ব দিয়ে মামলাটির ছায়া তদন্ত শুরু করেন। তারা সুড়ঙ্গ খোঁড়া কক্ষের বাসিন্দা সোহেলের বিস্তারিত তথ্য উদ্ধারের চেষ্টা করতে থাকেন।

পরে একপর্যায়ে তারা প্রযুক্তির সহায়তায় সোহেলের অবস্থান শনাক্ত করেন। থার্ড পার্টির মাধ্যমে সোহেলের ভাড়া নেওয়া বাসাটিও চিহ্নিত করে ফেলেন র‌্যাব কর্মকর্তারা।

পরে দুপুরে শ্যামপুর এলাকায় অভিযান শুরু হয়। র‌্যাবের গোয়েন্দা সদস্যরা ছদ্মবেশে শ্যামপুরে বালুর মাঠের ওই বাসার চারপাশে অবস্থান নেন। বিকাল ৩টার দিকে তারা ওই বাসার ভিতরে প্রবেশ করেন। এ সময় ষষ্ঠ তলার বাসার ভিতরে সোহেল ও ইদ্রিসকে পেয়ে যান।

পরে খাটের নিচে লুকানো অবস্থায় পাওয়া যায় পাঁচ বস্তা টাকা। টাকা উদ্ধার করে সহযোগীসহ সোহেলকে গ্রেফতার করে দ্রুত নিয়ে যাওয়া হয় র‌্যাব সদর দফতরে।

ad

পাঠকের মতামত

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *